শেখ হাসিনাকে নিশ্চিহ্ন করে চার-দলীয় জোট সরকারের শাসন দীর্ঘায়িত করতেই ২১ আগস্ট হামলা

2400

ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ (বাসস) : বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে নিশ্চিহ্ন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন তৎকালীন চারদলীয় জোটের শাসন ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ বর্বরোচিত ও নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী মোশররফ হোসেন কাজল আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক পেশকালে আজ এ কথা বলেন।
রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে একুশে আগস্টের ওই ঘটনায় আনা পৃথক মামলায় একই সঙ্গে বিচার চলছে।
আজ রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী মোশররফ হোসেন কাজল আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক পেশ করেন। তিনি তার যুক্তিতর্কে বলেন, যারা দেশ পুনরায় পাকিস্থান তথা ১৯৪৭-এ ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল তারাই বঙ্গবন্ধুকে স্ব-পরিবার হত্যা করেছে। হত্যাকারীরা ৭৫-এর ১৫ আগষ্ট শিশু শেখ রাসেলকেও হত্যা থেকে বাদ দেয়নি। সে একইভাবে ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুর রক্ত শেখ হাসিনাকে হত্যার লক্ষ্য করা হয়।
কাজল বলেন, তৎকালীন সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গ হাওয়া ভবনে বসে এ মামলার চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। যাতে হাওয়া ভবন কার্যালয়ের কর্ণধার তারেক জিয়া (তারেক রহমান) সরাসরি সম্পৃক্ত। তারেক রহমানের আশ্বাসে ও সহযোগিতায় ভয়াবহ ওই হামলা ঘটানো হয়েছে।
কাজল বলেন, হাওয়া ভবনসহ ১০টি স্থানে ২১ আগস্ট হামলার ষড়যন্ত্রমূলক সভা ও পরিকল্পনা করা হয়। যাতে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীসহ তাদের অনুগত প্রশাসনের কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা অনুযায়ি হামলা কারীরা হামলা ঘটিয়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
কাজল বলেন, ২১ আগস্ট ঘটনা প্রমাণিত। কারা কারা ষড়যন্ত্র করেছে, অর্থ ও গ্রেনেড দিয়েছে, ঘটনা ঘটিয়েছেন তার বিষয়ে আমরা সাক্ষ্য প্রমান দিয়েছি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে তাদের অনেকেই আফগানিস্তান ফেরত জঙ্গি। ২১ আগস্ট হামলা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সূদুরপ্রসারি লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়েই এ ঘটনার ছক করা হয়।
মোশররফ হোসেন কাজল তার যুক্তির পক্ষে বিভিন্ন মামলার রেফারেন্স তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রকৃত ঘটনা ও অপরাধীদের আড়াল করতে ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করা হয়েছে। নিরিহ জজ মিয়াকে সম্পৃক্ত করে নাটক তৈরী করে মামলাকে ভিন্নখাতে নেয়ার অপচেস্টা করা হয়েছে। কাজল তার যুক্তিতর্কে মামলায় অধিকতর তদন্ত কিভাবে করা যায় তার আইনি ভিত্তি তুলে ধরেন। কালও মামলার তারিখ ধার্য রয়েছে। কাল রাষ্ট্রপক্ষে মোশররফ হোসেন কাজল তার অসমাপ্ত যুক্তিতর্ক পেশ করবেন বলে সাংবাদিকদের জানান।
আজ মামলার কার্যক্রম শেষে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, মামলায় আজসহ মোট ২৬ কার্যদিবস রাস্ট্রপক্ষ এবং ৮৯ কার্যদিবস আসামীপক্ষ যুক্তিতর্ক পেশ করেছে। আজ ছিল মামলার যুক্তিতর্ক পেশের ১১৫ তম দিন।
তিনি বলেন, এ মামলার অধিকতর তদন্ত বিষয়ে আইনগত ও পদ্ধতিগত ভাবেই করা হয়েছে। এখানে কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি বলে তিনি দাবী করেন। মামলার অন্যতম আসামী মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় দফায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার ক্ষেত্রেও কোনে আইনগত ব্যত্যয় ঘটেনি।
এর আগে গত ৫ আগস্ট টানা ৮৯ কার্যদিবসে আসামীপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করেছে। এরপর ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী মোশররফ হোসেন কাজল আইনি পয়েণ্টে যুক্তিতর্ক পেশ শুরু করেন।
আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান, বিশেষ পিপি মো.আবু আব্দুল্লাহ্ ভ্ুঁইয়া, এডভোকেট আকরাম উদ্দিন শ্যামল, এডভোকেট ফারহানা রেজা, এডভোকেট আমিনুর রহমান, আশরাফ হোসেন তিতাস প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। আসামীপক্ষে আইনজীবী এসএম শাহজাহান, নজরুল ইসলাম, মাসুদ রানা প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
ফারহানা রেজা বলেন, পলাতক ১৮ জনের মধ্যে চারজন আসামীর বিষয়ে “রাষ্ট্র নিযুক্ত” আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়নি। তারা হচ্ছেন-আসামী সাবেক সেনা কর্মকর্তা এটিএম আমিন ও সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান খান ও খান সাঈদ হাসান। এ চার আসামীর আইন অনুযায়ি সর্বোচ্চ সাজা তথা মৃত্যুদন্ড হতে পারে এমন কোন ধারায় অভিযোগ গঠন হয়নি। তাই তারা ‘স্ট্যাট ডিফেন্স বা রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী’ সুবিধা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, গ্রেফতার ও পলাতক মিলিয়ে মোট ৪৫ আসামীর বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে।
উল্লেখ্য-এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২২৫ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেয়। আসামীপক্ষে সাক্ষিদের জেরা করেছে। গত বছরের ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দের জেরা শেষের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।
বিচারের মূখোমূখি থাকা ৪৯ আসামির মধ্যে জামিনে রয়েছেন- বেগম খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি’র সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডি’র সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ, সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম।
মামলার আসামী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, সেনা কর্মকর্তা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছেন।
উল্লেখ্য, ওই দিন আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে হামলার সময় দলটির সভানেত্রী ও ওই সময়ে বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা করছিলেন। বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট যুদ্ধাস্ত্র ভয়াবহ আর্জেস গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই নৃশংস হামলায় ২৪ জন নিহত ও দলটির নেতাকর্মী-আইনজীবী-সাংবাদিকসহ পাঁচ শতাধিক লোক আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পতœী আইভি রহমান। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অন্যান্য নেতা এই গ্রেনেড হামলায় মারাত্মক আহত হন। এতে অল্পের জন্য শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচন্ড শব্দে তার শ্রবণশক্তিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

image_printPrint