সুরভীর চাওয়া ঘরে ঘরে ‘শরবিন্দু’ পৌঁছে দেয়া

176
image_printPrint

॥ মাহবুব আলম ॥
ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ (বাসস) : প্রতিটি মানুষেরই একটা স্বপ্ন থাকে, লক্ষ্য থাকে। যার জন্য নিজকে প্রস্তুত করে প্রতিটি মানুষ। কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কেউবা চাকুরি আবার কেউ হতে চায় ব্যবসায়ী। মূলত ছাত্র জীবন থেকেই একজন মানুষের স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়। সে লক্ষ্যেই মানুষ পড়াশোনা লেখাপড়া শেষে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। আজকাল অনেকেই আবার চাকুরি না খুঁজে নিজেই উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চান। এমনকি শিক্ষা জীবন শেষ না হতেই অনেকে নিজের পথ খুঁজে নেন। তেমনই একজন সুরভী। যার স্বপ্ন যে উদ্যোক্তা হওয়ার, চাকরি-বাকরিতে ঝোঁক থাকবে কেন! তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই নিজে নিজে কিছু একটা করার চেষ্টা। আর সেই চেষ্টা থেকেই গড়ে তুললেন দেশীয় পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘শরবিন্দু’।
সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল ও জনশক্তি ব্যবহার করে নকশায় তৈরি ও বিপণন করছে ভিন্ন ধাচের আধুনিক পোশাক। আর তাতেই ভাগ্য খুলেছে তরুণ উদ্যোক্তা হাবিবা আক্তার সুরভীর।
প্রথমে অনলাইন বিশেষ করে ফেসবুকে নিজের স্বপ্নের ব্র্যান্ড ‘শরবিন্দু’র প্রচার শুরু করলেও এখন দুই মাধ্যমেই চলে এর প্রচারণা। অনলাইন-অফলাইন- দুই জায়গাতে ব্যবসাও বাড়ছে হুড়-হুড় করে।
স্বপ্ন বুনার দিনগুলোর কথা জানিয়ে সুরভী বললেন, চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের একটা উক্তি আছে- যা আমি খুব বিশ্বাস করি। কথাটা অনেকটা এ রকম ‘তুমি যে কাজটা খুব ভালো পারো, সেটা কখনো বিনামূল্যে করো না।’
‘সে বিশ্বাস থেকেই মনে হয়েছে, আমি যা ভালো পারি, তা নিয়েই কিছু করা যায় কিনা। এমন ভাবনা থেকেই তিল তিল করে গড়ে তুলি পোশাক ব্র্যান্ড শরবিন্দু।’
সম্প্রতি এক আলাপচারিতায় সুরভী জানালেন, মনের আনন্দে কাজ করেই আজ স্বাবলম্বী হয়েছি। এক্ষেত্রে কুনফুসিয়াসের কথাটাও বেশ কাজে দিয়েছে। এখন আমাকে দেখে অন্যরাও নিজে কিছু করার জন্য এগিয়ে আসে।
সুরভী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগে পড়ছেন। পড়াশোনা প্রায় শেষের দিকে। চারুকলায় ভর্তি হয়ে তার স্বপ্নটা যেনো বাস্তবে রূপ পেয়েছে।
জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকেই পোশাকে নকশা করেছি। সেটা একান্তই ঘরোয়াভাবে। আর এসব দেখে কাছের মানুষেরা বেশ প্রশংসা করতেন আবার উপহারও দিতেন; তাতে বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছি। আর চারুকলায় ভর্তি যেনো আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
সুরভী বলেন, হাতখরচের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে খন্ডকালীন কাজ করি। তবে বেশি ভালো লাগেনি। তাই ছেড়ে দিই। এক সময় ভাবি, এখন না হয় ছাত্র, কিন্তু ভবিষ্যতে কিছু একটা করতেই হবে।
‘সেই চিন্তা থেকেই ভাবলাম, ছাত্রজীবনেই যদি এমন কিছু করা যায়, যাতে আর আমাকে চাকরি করতে না হয়। পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানও হবে, মন্দ কী?’
সেই ভাবনা থেকেই আস্তে আস্তে নামেন ‘শরবিন্দু’ গড়ার কাজে। তবে পুরোদমে শুরু হয় ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে। এক্ষেত্রে প্রথমেই বেছে নেন তথ্যপ্রযুক্তিকে। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শরবিন্দু নামে একটি পেজ খুলেন। চালু করেন একটি ওয়েবসাইটও।
এভাবেই নিজে নিজেই অবসর সময়ে প্রচারণা শুরু করেন বলে জানান উদ্যোক্তা সুরভী। তিনি বলেন, এতে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। আমি যেহেতু নকশাটা বেশ ভালো করতে পারি তাই এ বিষয়টায় আলাদা করে নজর দিই। এভাবেই নিত্যনতুন নকশা করা শরবিন্দুর পোশাক বেশ সাড়া ফেলে ফ্যাশন প্রেমীদের মধ্যে।
নিজের করা নকশার বিষয়ে এই ডিজাইনার বলেন, ক্রেতাদের চাহিদা ও দাম এবং এর সঙ্গে গুণগত মানের বিষয়টা লক্ষ্য রেখে কাজ করছি।
গত দুই বছরের যাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমে অনলাইনে ছিলো। ক্রেতাদের সাড়া পাওয়ায় এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিই একটি আউটলেট খুললে মন্দ হয় না।
আর এতো দিনে প্রায় পরিচিতজন ছাড়াও বিভিন্ন মহলে উদ্যোক্তা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে সুরভীর নাম। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকেও অর্ডার আসতে শুরু করে।
‘বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসায় আমি বেশ কাজের চাপে পড়ি। একা সামলে ওঠতে পারছিলাম না। তখন আমার এক বন্ধুও এগিয়ে আসেন, তার নাম তানভীর হোসেন। ব্যবসার প্রসারে তার অবদান রয়েছে বেশ,’ বলেন হাবিবা সুরভী।
তিনি বলেন, প্রথমে আমি-ই সবকিছু দেখতাম। কিন্তু তানভীর সম্পৃক্ত হলে আমি শুধু পোশাকে নকশা, কন্টেন্ট তৈরি ও কাস্টমার কেয়ার বিষয়ে নজর দিই। আর তানভীর প্রোডাক্ট ফটোগ্রাফি, প্রোডাকশন ও মার্কেটিং বিষয়টা দেখেন।
ব্যবসার বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে এই উদ্যোক্তা বলেন, শুরুটা হয়েছিল ফেসবুকের একটি পেজ দিয়ে। এখন একটি আউটলেট ছাড়াও শরবিন্দুর কারখানা রয়েছে। কোম্পানিতে সব মিলিয়ে শতাধিক কর্মী কাজ করছেন।
পরিবারের সদস্যদের সমর্থন বিষয়ে তার ভাষ্য, ছোটবেলায় একজন প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু বড় হয়ে আর সেদিকে পা মাড়াইনি। নিজের স্বাধীনতাকেই মা-বাবা সমর্থন দিয়েছেন। মূলত তাদের জন্যই আমি এখন একজন উদ্যোক্তা।
নিজের উদ্যোগ নিয়ে ভবিষ্যত ইচ্ছার কথা বলেন, ‘আমি ভালোবাসি পোশাকে নকশা করতে। এই কাজটাই করে যেতে চাই। কাজ করতে করতে দেখতে চাই যেনো দেশের প্রতিটি ঘরেই কমপক্ষে একটি শরবিন্দুর শপিং ব্যাগ থাকে।
আর নতুনদের উদ্দেশ্যে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘শরবিন্দুকে এগিয়ে নিতে কাজ করেছি। কর্মীরাও আমাকে সহযোগিতা করেন। শূন্য থেকে কিছু করতে গেলে সমস্যা আসবে তবে একাগ্রতা ও পরিশ্রম দিয়ে তা মোকাবেলা করতে হবে।’