নির্বাচনের প্রাক্কালে নতুন রাজনৈতিক জোটকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ (বাসস) : আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্ভূত নতুন রাজনৈতিক জোটকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল দলের অংশগ্রহণেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে তো রাজনৈতিক দল দুইটি। একটি আওয়ামী লীগ অপরটি আওয়ামী লীগ বিরোধী। আওয়ামী লীগ বিরোধীদের তো একটা জায়গা লাগবে। এ জন্য তারা যে ঐক্য করেছে আমি তাদের সাধুবাদ জানাই যে, ঐক্যটা থাক।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেলে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন এবং অন্যদের নিয়ে নতুন জোট গঠন সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘তার দলও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একটি ভালো বিরোধী জোট প্রত্যাশা করে।’
অতীতে জোটের নেতৃবৃন্দের কেউ কেউ সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করবো তাদের জোট নির্বাচন বানচালের জন্য নয় বরং সংঘবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের জন্যই হবে।’
বিমসটেক সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পর সেই বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন হলেও আগামী নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার, খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং রোহিঙ্গা সমস্যার মত বিষয় সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে স্থান করে নেয়।
শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে ইভিএম’র আংশিক ব্যবহারকে সমর্থন করে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে এর ব্যাপক ব্যবহারের জন্য আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কিন্তু বিএনপি ইভিএম পদ্ধতির বিরোধিতা করছে। কারণ কি তাদের জাল ভোট প্রদানের নীল-নকশা বানচাল হয়ে যাবে, এই ভয়ে।’
তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল যারা অতীতে ভোট চুরি ও ভোটের কারসাজিতে অভ্যস্ত ছিল তারাই কিনা এখন নির্বাচনের অনিয়মের বড় বড় কথা বলছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ, জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেয়ার রাজনীতি আমরা করি না। জনগণ যদি ভোট দেয় তবেই আমরা ক্ষমতায় থাকবো, না হলে নয়। আর আমার বিশ্বাস থেকেই আমি কথাগুলো বলছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো ক্ষমতা নেই এই নির্বাচনকে বানচাল করার। কারণ, এটাই দেশকে এগিয়ে নেয়ার একমাত্র পথ এবং জনগণও এটা জানে যে, দেশে কেবল গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেই দেশ উন্নত হতে পারে।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রই যেন দেশে এক সময় একটা প্রচলিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ’৭৫-এ জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর। তাঁর নিজের ওপরও বেশ কয়েকবার প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে একটি সুবিধাবাদী মহল রয়েছে যাদের দেশে অগণতান্ত্রিক সরকার থাকলে বেশ সুবিধা হয়, তারা কদর পায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগ পায়।
২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশ কয়েকটি আসনে সাংসদরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় দেশের সেই স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনের নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। কিন্তু নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের মধ্যে ড. কামাল হোসেন নিজেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েই জাতীয় সংসদ সদস্য হয়েছিলেন।
তিনি স্মরণ করেন বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া নির্বাচনী আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ড. কামাল হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের জন্য কমিশন গঠন হতে পারে বলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকান্ডের আত্মস্বীকৃত খুনীদের আমরা বিচার করেছি। কিন্তু এর ষড়যন্ত্রকারী যারা তাদের কোন তদন্ত হয়নি বা বিচার হয়নি এবং সেটা হওয়া উচিত এটা হলো বাস্তবতা। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক রিপোর্ট আছে, অনেক গবেষণা হয়েছে। তাই একটা সময় আসবে যখন দেখা যাবে এগুলোও বেরিয়ে আসবে।’
সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এইচ মাহমুদ আলী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচনকালীন সরকারের রুপরেখা সংত্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের উচ্চ আদালতের রায় রয়েছে কোনদিন অনির্বাচিত সরকার এ দেশে ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।’
তিনি বলেন, ভারতে যে নির্বাচন হয় সেখানে যে সরকারে থাকে, নির্বাচনকালীন তারাই ক্ষমতায় থাকে। সংসদ বলবৎ থাকে এবং নির্বাচন হয় ৫ বছরের সময়ের মধ্যে। এর প্রায় দুই মাস আগে সিডিউল ঘোষণা হয় এবং কার্যক্রম চলতে থাকে। কিন্তু সরকার থেকেই যায় এবং নতুন সরকার শপথ নিলে আগের সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত এবং ব্রিটেন যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে সেখানে এই নিয়মই বলবৎ রয়েছে। ব্যতিক্রম হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন হলে। সে সময় সংসদ ভেঙ্গে দিতে হয় এবং সংসদ ভেঙ্গে দিলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হয়। আমাদের সংবিধানেও একই বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে রয়েছে ৬০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন বসতে হবে। তবে, ৫ বছরের মেয়াদ যখন শেষ হবে তার তিন মাস আগে কিন্তু এই ৬০ দিনের বাধ্যবাধকতা নেই। সংসদ থাকবে কিন্তু এর কার্যকারিতা থাকবে না। তবে, সংসদ কখনই শেষ হয়ে যায় না। জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি চাইলে আবার সংসদের বৈঠক ডাকতে পারেন।
শেখ হাসিনা বলেন, একটি সরকার থেকে আর একটি সরকারের যে অন্তর্বর্তীকালীন সময় সে সময়ে যেন কোন সাংবিধানিক শূন্যতা না সৃষ্টি হয় সে জন্যই এটা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তিনি এ বিষয়ে বিমসটেক সম্মেলনে নেপাল এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছেন। নেপালে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হয় বলে তাদের সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী আসবেন তাকে দুই বছরের মধ্যে সরানো যাবে না। প্রত্যেকটা দেশেই এ ধরনের নিজস্ব ব্যবস্থা আছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি যে দাবি করেছে আমি আগেও বলেছি- খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার করা হয়নি। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন এতিমের টাকা চুরি করে।
শেখ হাসিনা বলেন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার মামলা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ মামলা দেয়নি। আওয়ামী লীগ মামলা দিলে নির্বাচন বানচালের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারার অপরাধেই তাকে গ্রেফতার করা হতো। আর ১০ বছর মামলা চলার পরও বিএনপি’র নামজাদা আইনজীবীরা কেনো খালেদা জিয়াকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলে নাÑ সে প্রশ্লও তোলেন তিনি।
নির্বাচনে অংশ নেয়া বা না নেয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি’র নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে তাঁর বা সরকারের কিছু করার নেই বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ বা আলোচনায় বসবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
এই সিদ্ধান্ত তিনি ২০১৫ সালেই নিয়েছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ওই বছরের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে। কারণ, কার্যালয়ের ফটক ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখে তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সেদিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ওদের সাথে আমি আর বসবো না। ওদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না, প্রশ্নই ওঠে না। আপনারা যে যাই বলুনÑ ক্ষমতায় থাকি আর না থাকি, আমার কিছু যায় আসে না।’
তিনি বলেন, ‘আমার একটা আত্মসম্মান বোধ আছে, অপমানের একটা সীমা আছে। যারা দিনের পর দিন আমাদের বাড়িতে এসে পড়ে থাকতো, তারা মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়ার সাহস রাখে।’
জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অস্থিরতার শঙ্কা-উদ্বেগ নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘নির্বাচন হবেই। কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারও শক্তি নেই নির্বাচন ঠেকানোর। যারা ঠেকাতে চেয়েছিল, তাদের আগেরবার যেমন জনগণ মোকাবেলা করেছিল, এবারো করবে।’
পুনরায় সরকার গঠনে কতটা আত্মবিশ্বাসী- এ প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমার বিশ্বাস ও আস্থা আছে। জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেবে এবং আমাদের জয়ী করবে।’ তবে, ভোট না দিলে কোন আফসোস নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ষড়যন্ত্রকারী সক্রিয় এবং তাদের ষড়যন্ত্র জনগণই মোকাবেলা করতে পারবে আশাবাদ ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, জনগণের কাছে প্রত্যাশা আমরা যদি আবার ক্ষমতায় আসতে পারি উন্নয়নের যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছি তা অন্তত শেষ করতে পারবো।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘ক্ষমতায় না আসতে পারলে অতীতে যারা লুটপাট করেছে, এতিমের টাকাও মেরে খাবে তখন। সকলের জন্যই বিপদ আসবে। সুদিনের দেখা তখন আসবে না, দুর্দিন আসবে। সেটা সম্পর্কে আমি আশা করি জনগণ সতর্ক থাকবে।’
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি দিয়ে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর প্রোপাগান্ডামূলক একটি বই প্রকাশের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এভাবে ভুয়া ছবি দিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে জঘন্য কাজ করেছে। কিন্তু এটা তারা কার কাছ থেকে শিখলো? আমাদের দেশেও তো হয়েছে। একেবারে কাবা ঘরের সামনে ব্যানার ধরার ছবির মিথ্যাচারও আমরা দেখেছি। সুতরাং এসব মানুষের কাছে ধরা পড়ে যায়। মিয়ানমার সরকারও ধরা পড়ে গেছে।
বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক বড় প্লাটফর্মের আলোচনায় মিয়ানমারের সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি এসেছে কি-না, প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিমসটেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় উঠেছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি। এ ছাড়া সম্মেলনের ফাঁকে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও এ নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা হয়েছে।