বিমসটেকে সহযোগিতা সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রীর আহবান

361
image_printPrint

কাঠমান্ডু, নেপাল, ৩০ আগস্ট, ২০১৮ (বাসস) : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে যৌথ প্রচেষ্টা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার মাধ্যমে বিমসটেক ফোরামে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘সকল ক্ষেত্রে নতুন গতিশীলতার কারণে বৈশ্বিক দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক এই ত্রিমুখী সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন গতিশীলতা ও চলমান বাস্তবতার সঙ্গে সমভাবে এগিয়ে যেতে হবে।’
আজ এখানে হোটেল সোয়ালটি ক্রাউন প্লাজায় চতুর্থ বিমসটেক সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন, ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সৃষ্টি, বিনিয়োগ ও জ্বালানি খাতে যৌথ প্রচেষ্টা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং অর্থায়ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার মাধ্যমে বিমসটেক ফোরামে আমাদের সহযোগিতা সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।’
বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল এন্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের (বিমসটেক) শীর্ষ সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘টুওয়ার্ডস এ পিসফুল, প্রসপারাস এন্ড সাসটেইনেবল বে অব বেঙ্গল রিজন।’
নেপালের প্রধানমন্ত্রী এবং চতুর্থ বিমসটেক সম্মেলনের চেয়ারপার্সন কে. পি শর্মা ওলী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ভুটানের অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দাশো সেরিং ওয়াংচুক এবং বিমসটেকের অন্যান্য নেতারা উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, গত একুশ বছরে বিমসটেকের কিছু ভালো সাফল্য আছে যদিও আরো বিপুল কাজ আমাদের সামনে পড়ে আছে।
তিনি বলেন, দৃশ্যমান ফলাফল পেতে আমাদের বাস্তব সহযোগিতা এগিয়ে নিতে মৌলিক আইনি কাঠামো সংহত করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রনে ২০১৬ সালে গোয়ায় অনুষ্ঠিত বিশেষ বিমসটেক রিট্রিট ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গোয়ায় গৃহীত ১৬ দফা কর্মপন্থার কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে, অনেকগুলো অচিরেই বাস্তবায়িত হবে।
বিমসটেকের কিছু সদস্য দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগে বিদ্যুতের গ্রিড সংযোগের জন্য সন্তোষ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, অন্যদের অংশ গ্রহণে এটি বিমসটেক ইলেক্ট্রিসিটি গ্রীডে পরিণত হতে পারে। তিনি বিমসটেক থেকে দ্রুত সাফল্য পেতে আরো বেশি সহানুভূতিশীল, মনোযোগ নিবদ্ধন এবং বাস্তবায়নযোগ্য করে তুলতে ১৪টি খাতকে বিভিন্ন গুচ্ছে নির্দিষ্টকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জ্বালানি, দারিদ্র বিমোচন এবং কৃষিখাত থেকে জনগণ সরাসরি অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান হতে পারে যদি এগুলোকে ‘টেকসই উন্নয়ন’ নামে একটি গুচ্ছে শ্রেণীভুক্ত করা যায়। নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, ক্লাইমেট চেঞ্জ এন্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট যেগুলো আমাদের সুরক্ষা দেবে, সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সেগুলোকে ‘নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্ব’ নামে অপর একটি গুচ্ছের আওতায় আনা যেতে পারে। আবার পিপল টু পিপল কনট্রাক নামে তৃতীয় ক্লাস্টারের আওতায় আমাদের সংস্কৃতি ও জনস্বাস্থ্য আনা হলে সেটি আমাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। একইভাবে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে বিমসটেক কাঠামো এবং সুযোগ মূল্যায়নের বিষয়টি আমরা বিবেচনা করে দেখতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সাড়ে চার বছরে বিমসটেককে সামনে এগিয়ে নিতে সহযোগিতার জন্য নেপাল সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। এরপর থেকে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিমসটেককে বিশ্বের সম্ভবনাময় গতিশীল অঞ্চল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমসটেকের মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতাকে বাংলাদেশ সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় বিমসটেকের সচিবালয় থাকা বিমসটেক ফোরামের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।
শেখ হাসিনা বলেন, এ অঞ্চলের দেড়শো কোটি লোক যা বিশ্ব জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। ফলে, বিমসটেকে আন্তঃবাণিজ্য সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এই ব্যাপক সম্ভাবনা আমাদের কাজে লাগাতে হবে, যার অধিকাংশ এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
গত ১০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করে দেশটিক অর্থনৈতিক বিস্ময়ের দেশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, চলতি বছরের প্রথমদিকে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। চলতি অর্থ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ১,৭৫২ মার্কিন ডলারে পৌঁছে যা ২০০৬ সালে ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে যা ২০০৬ সালে ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশেকে বিশ্বের ৪৩তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এবং পার্সেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) হিসেবে ৩২তম হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এছাড়া প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্স বলেছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশ পরিণত হতে বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ, দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সকল উপায় অন্বেষণে অঙ্গীকারবদ্ধ।
তিনি বলেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর উন্নয়ন নির্ভর করে। তাই বাংলাদেশ স্থিতিশীল ও টেকসই সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ব্যাপক উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বৈষম্য দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও সন্ত্রাস অন্যান্যের মতোই আমাদেরও অভিন্ন সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের শীর্ষ দেশ হিসেবে আমরা অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচি শুরু করেছি।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের শূন্য সহিষ্ণুতা নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব ধরণের সন্ত্রাস ও জঙ্গি নির্মূলে সরকার কঠোরভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকায় চলতি বছরের প্রথম দিকে বিমসটেকের নিরাপত্তা প্রধানদের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে আমরা অর্থপূর্ণ সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছি।