সাজেদা নীরবে পাল্টে দিল সমাজ

ঢাকা, ২৩ আগস্ট, ২০১৮ (বাসস) : বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। সূর্যের গায়ে সবে লেগেছে রক্তিম আভা। এই আভায় আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল মেয়েটিকে। ঠিক এ সময় দোচালা টিনের ঘরের ছোট্ট দাওয়ায় বসে কিশোরী সাজেদা আক্তার বলছিলো তার সামাজিক আন্দোলনের কথা, কীভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে ১০৭টি বাল্যবিবাহ রোধ করেছে। কথাগুলো বলার সময় তার চোখে-মুখে ছিল এক অন্যরকম আত্মপ্রত্যয়। শিশু অধিকার রক্ষার বিশেষ অবদানের জন্য ‘ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন্স পিস প্রাইজ’ পাওয়া এই কিশোরী এখন এক সাহসী প্রতীক।
বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের মাইঠা গ্রামের দরিদ্র রিকশা চালকের মেয়ে সাজেদা। বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী। নিজের গ্রামের অল্প বয়সী মেয়েদের বিবাহিত জীবনের ভয়াবহ পরিণতি বিশেষ করে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা তাকে ব্যথিত করতো। ইউনিয়নের স্বাস্থ্য কর্মীদের কাছ থেকে রেডিও শুনে এবং স্বাস্থ সহায়িকা পত্রপত্রিকা পড়ে সে জানতে পারে বাল্যবিবাহ কেনো এতো ক্ষতিকর। এই বাল্যবিবাহের কারণে কিভাবে নাবালিকা মেয়েরা অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
২০০৭ সালে সিডরের পর বিদেশী সাহায্য সংস্থা প্লান ইন্টারন্যাশনাল কাজ করতে শুরু করে বরগুনায়। ২০০৯ সালে এই সংস্থার শিশু ইউনিটের সদস্য হয় সাজেদা। তার সাংগঠনিক কর্মদক্ষতার কারণে এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচন করা হয় তাকে। এরপর গ্রামের কিশোর-কিশোরী ক্লাবেরও সদস্য হয় সাজেদা। এই সংগঠনের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে গান, নাটক, সভা ইত্যাদির মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, মাদক বিরোধী সচেতনতামূলক কর্মকান্ড শুরু করে এই সংগঠন। তার কাজে উৎসাহিত হয়ে গ্রামের একশ’টি মেয়ে যোগ দেয় তার সাথে। ধীরে ধীরে আরো যোগ দেয় বুড়িরচর ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণির সচেতন মানুষ। এদের নিয়ে একর পর এক বাল্যবিবাহ রোধ করতে থাকে সাজেদা। সেই সাথে নারী উত্যক্তকারী বখাটেদের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই কাজে নানা প্রতিবন্ধকতা আসে। তাকে পথে গুপ্ত হামলার শিকার হতে হয়। তার বাড়িতে হামলা হয়। তবু থেমে থাকেনি সাজেদা।
সাজেদার এই প্রয়াস গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ‘ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন্স পিস প্রাইজ’-এর জন্য বাংলাদেশ থেকে তাকে মনোনীত করা হয়। ২০১৩ সালে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।
সাজেদার এই আন্দোলন সম্পর্কে বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. নুরুজ্জামান বলেন, একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যেভাবে সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তা সমাজের এক বিরল দৃষ্টান্ত। তার কারণে অনেক ঝরে পড়া মেয়ে শিশু আবার স্কুলে ফিরে গেছে। সাজেদা বলেন, ‘যারা আমার কাজে বাধা দিয়েছিলো তারাই এই সাহসী কাজের প্রশংসা করে। আমি আমার কাজ থেকে সরে যাবো না।’
ইউনিসেফের তথ্য মতে, বাংলাদেশে ১৮ বছরের নিচের ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছেÑ যা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ। শিশু মৃত্যুর ঘটনা রয়েই গেছে। জাতীয় কন্যাশিশু এ্যাডভোকেসি ফোরাম সূত্রে জানা যায়, দেশে বাল্যবিবাহের হার ২০০৪ সালে ছিলো ৬৮ এবং ২০০৯ সালে ছিলো ৬৪ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে ৬৬ শতাংশে দাঁড়ায়। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৬৯ শতাংশ। বিবাহিত মেয়ে শিশু তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে যেমন সচেতন নয়, তেমনি দাম্পত্য জীবন ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কেও সচেতন নয়। সংসার সম্পর্কে কিছু বোঝার আগেই সংসারে প্রবেশ করায় শ্বশুর বাড়ি থেকে চাপ সৃষ্টি হয়। শুরু হয় অশান্তি, পারিবারিক কলহÑ সেই সাথে পারিবারিক নির্যাতন। মায়ের ওপর এই নির্যাতনের শিশুরাও ভোগে মানসিক অশান্তিতে। তারা লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়। নানা অনৈতিক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে। বাল্যবিবাহের কারণে ছেলে ও মেয়ে উভয়ে শিক্ষা, স্ব্যাস্থ, বিনোদনের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বাল্যবিবাহ আইন ও সংবিধান পরিপন্থী। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট’ সূত্রে জানা যায়, সাধারণত মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, ধর্মীয় শিক্ষক, মৌলভী, ঠাকুর, পুরোহিত, স্থানীয় মুরব্বি, বিবাহ নিবন্ধকের সহকারীরা বিয়ে পড়িয়ে থাকেন। এরা সকলে যদি উদ্যোগী হন তাহলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব। সাজেদা আক্তার জানে সরকারের এই পদক্ষেপের কথা। ‘মোরা যদি প্রথম থাইক্যা সরকারি সহযোগিতা পাইতাম তা হইলে মোগো কাজ আরো নিরাপদ ও জোরদার হইতো। একলা ফাইট দেয়া কডিন। তাও ভয় পাই নাই।’ সাজেদা তার এই কাজ আরো বৃহত্তর পরিসরে এগিয়ে নিতে চায়। কারণ, এই সমস্যার অতল অন্ধকারে রয়েছে এখনো বাংলাদেশের বহু গ্রাম।