কর্মজীবী নারীর পাবলিক বাস

306

॥ সেলিনা আক্তার ॥
ঢাকা, ২৩ আগস্ট, ২০১৮ (বাসস) : ঢাকা জজ কোর্টে শিক্ষানবিশ আইনজীবী সাকেউন নাহার তুলি। থাকেন টঙ্গী। অফিস পুরনো ঢাকার জজ কোর্টে। ৫৫ মিনিটের রাস্তা। দেড় ঘন্টা থেকে ২ ঘন্টার আগে কখনো পৌঁছা যায় না। কখনো কখনো ৩ থেকে ৪ ঘন্টা বাসে বসে কাটাতে হয়।
তিনি জানান, নিয়মিত যাতায়াতের ভোগান্তি মাথায় নিয়েই চলাচল করছি। কি ধরনের ভোগান্তি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাবলিক সার্ভিস বাসে যাত্রীর ভিড়ে ওঠা যায় না। উঠতে গেলে সবসময় নারী যাত্রী নিতে চায় না হেলপাররা। ওঠার সময় হেলপার গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করে। ওঠার পর সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হয়। টাউন সার্ভিস পাবলিক বাসে পুরুষ যাত্রীদের সাথে ঠেলাঠেলি ও ঠাশাঠাশি করে আমাদের যাওয়াটা বিব্রতকর ও অপমানজনকও।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন নাজনীন পায়েল। অফিস গুলিস্তানে। থাকেন কল্যাণপুরে। প্রতিদিন সকালে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে বাসে উঠতে হয়। তিনি পাবলিক বাসে যাতায়াত করেন। অনেকক্ষণ পর ধাক্কাধাক্কি করে ভিড় ঠেলে বাসের কাছে এগিয়ে যেতেই বাসের ভেতর থেকে হেলপারকে উদ্দেশ করে কন্ডাক্টর চিৎকার করে বলে ওঠে, মহিলা তুলিস না। মহিলা সিট খালি নাই। সঙ্গে সঙ্গে হেলপার আমাকে বাসে উঠতে বাধা দিলো। আরো অপেক্ষার পর অন্য একটি বাসে উঠে দেখি নারীদের জন্য নির্ধারিত আসনে পুরুষ যাত্রী বসে আছে। এভাবে নিয়মিত বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি ঠেলে দেরিতে অফিসে গিয়ে শুনতে হয় বসদের তিরস্কার। এই সমস্যা শুধু তুলি কিংবা পায়েলের নয়, কর্মজীবী নারীদের নিত্যদিনের ঘটনা।
সরকারি চাকরিজীবীদের কেউ কেউ অফিসের গাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ পেলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের অফিসের গাড়িতে যাওয়া-আসার সুযোগ খুব কম। ফলে অফিসে যাওয়ার সময় বাসে উঠতে না পারায় নারীদের পক্ষে ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছানো যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি অফিস ছুটির পর ক্লান্ত শরীরে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় একটি মহিলা বাস কিংবা সাধারণ বাসে ওঠার অপেক্ষায়।
‘দেশে নারী শিক্ষা দিন দিন বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যাও। রাজধানীতে তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু অফিস-আদালতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে তারা বিড়ম্বনা ও ভোগান্তিতে পড়েন। চাকরি ছাড়াও নানা সময় নানা প্রয়োজনেও ঘরের বাইরে নারীর পদচারণা বাড়ছে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে তারা নব নব বাস্তবতা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারা সাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছেন না।
পৃথক মহিলা বাস সার্ভিস বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক দাবি করা হচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, চাহিদা নেই। এ ক্ষেত্রে নারীদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ।
২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশে লেবার ফোর্স সার্ভে করে। তাতে দেখা যায়, ২০০২-০৩ সালে শ্রমবাজারে নারীর উপস্থিতি যেখানে ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ, এক বছরের মাথায় তা এসে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক ২ শতাংশে। পাঁচ বছরের মাথায় বর্তমানে তা আরো অনেক গুণ বেড়ে যাওয়ারই কথা।
ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটির (ঢাকা মেট্রো আরটিসি) শর্তানুযায়ী, ঢাকার বড় বাসে নয়টি এবং মিনি বাসে ছয়টি আসন শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত। তবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের এ শর্ত অনেক বাসেই মানা হয় না। ৯টি মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্যে সংরক্ষিত সিটের বাইরে বাদ বাকি কমন সিটগুলো ধরা হয় কেবলমাত্র পুরুষের জন্যেই।
ঢাকার সড়কে ১৯টি বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৯টা ৫ মিনিট ও ১০টা ১০ মিনিট রাজধানীর তালতলা থেকে মতিঝিল এবং সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিট ও ৬টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে তালতলা, সকাল সাড়ে ৮টায় নতুনবাজার থেকে মতিঝিল এবং বিকাল ৬টা ১০ মিনিটে মতিঝিল থেকে নতুন বাজার, সকাল সোয়া ৭টায় ও সোয়া ৮টায় আবদুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল এবং বিকেল সোয়া ৫টা ও সোয়া ৬টায় মতিঝিল থেকে আবদুল্লাহপুর, সকাল সাড়ে ৭টায় মিরপুর-১২, মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল বাস ডিপো এবং সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মতিঝিল দ্বিতল বাস ডিপো থেকে মিরপুর-১২ ও মিপুর-১০, সকাল ৮টায় মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল এবং বিকেল সোয়া ৫টায় মতিঝিল থেকে মিরপুর-১০, সকাল ৮টায় মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টায় মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুর, সকাল পৌনে ৮টায় ও সোয়া ৮টায় নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিল এবং বিকাল সোয়া ৫টা ও ৬টায় মতিঝিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটিসি’র মহিলা বাস সার্ভিস চালু রয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর মিরপুর-১২ থেকে আসাদগেট হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত মহিলা স্কুল বাস সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে। কর্মজীবী নারীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তা বিবেচনায় নিয়ে বিআরটিসি মহিলা বাস সার্ভিস আরো বাড়ানো জরুরি বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
গাজীপুরের চৌরাস্তায় অবস্থিত বিজিআইএফটি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি (বিআইএসটি)‘র পরীক্ষা সমন্বয়ক লেখিকা আমেনা খানম মীনা বলেন, কর্মজীবী নারীরা স্বামী-সন্তান ও সংসার সামলিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে পুরুষের সমান শ্রম দিচ্ছেন। এই শ্রম সমাজ, রাষ্ট্র তথা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই নারীর কর্মময় যাতায়াত নিরাপদ মসৃণ ও স্বাভাবিক হওয়া জরুরি। কর্মজীবী নারীর অধিকাংশই বাসের ওপর নির্ভরশীল। তাই আমি মনে করি, বাসের হেলপার ও কন্ডাক্টরদের কৌশলগত ও আচরণগত প্রশিক্ষণ জরুরি। পাশাপশি পুরুষ যাত্রীদের মানসিকতার পরির্বতন হওয়া উচিত। যে এলাকায় কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেশি সেই অনুপাতে মহিলা বাসের সংখ্যা বা পাবলিক বাসে নারী আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা একান্ত জরুরি প্রয়োজন।
ঢাকা শহরের সিটি বাসগুলোতে ৬টি বা ৯টি সিট নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রাখা আছেÑ যা নিত্যদিনের ঢাকা শহরের নারী যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে আরো বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে, কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতে পরিবহন সঙ্কট দূরা করা জরুরি।
সামাজিক সংগঠন ‘জনতার ধ্বনি’র চেয়ারপার্সন, বিশিষ্ট লেখিকা, কলামিস্ট ও সংগঠক মর্জিনা আফসার রোজী বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে পুরুষের পাশাপশি নারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কর্মজীবী নারীদের চলাচলে ও যাতায়াতে নারীবান্ধব আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। দিন দিন যেমনিভাবে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ছে, ঠিক তেমনিভাবে টাউন সার্ভিস পাবলিক বাসে নারীদের আসন সংখ্যা বাড়ানো দরকার। রাজধানীর সব রুটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মহিলা বাস খুবই জরুরি। বর্তমান সরকারকে বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। এ জন্য বিআরটিসি’র মহিলা বাস সার্ভিসের রুট ও শিফট বাড়ানোসহ সার্ভিসের মানোন্নয়নও জরুরি। দরকার বেসরকারি খাতে মহিলা বাস সার্ভিস চালু উৎসাহিত করা। কর্মজীবী নারীদেরও উচিত নিজেরা সংগঠিত হয়ে তাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা এবং তাদের জন্য পরিচালিত বাস কিভাবে লাভজনক করা যায় তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বর্তমান সরকার কর্মজীবী নারীদের যোগাযোগ ও পরিবহন সমস্যা সামাধানে যথেষ্ট আন্তরিক।
পাবলিক বাসে নারীদের ভোগান্তি নিয়ে কথা হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে। বর্তমানে শিক্ষাসহ কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী বাসযাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সে অনুযায়ী কর্মজীবী নারীদের জন্য মহিলা বাস থাকা উচিত কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তবে এ ক্ষেত্রে অর্থাৎ মহিলা বাস চালুর ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়লেও ভারত বা অন্যান্য উন্নত দেশের পর্যায়ে যায়নি। তাই মহিলা বাসের তেমন কোনো যৌক্তিকতা এ দেশে নেই। এ ক্ষেত্রে অফিস মালিকরা নারী কর্মীদের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারেন এবং তাদের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে নারীদের জন্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করলে তারা বরং লাভবান হবেন।
নারী সংরক্ষিত আসনে পুরুষের বসে থাকা প্রসঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের পাশাপাশি নারী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত যারা তাদের এগিয়ে আসা উচিত। তারা নারী অধিকারের ব্যপারে যেসব জায়গায় নারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন সেসব জায়গায়গুলো একটু মনিটরিং করে দেখতে পারেন। অর্থাৎ সরকারই নয়Ñ এসব বিষয়ে আপামর জনসাধারণের একটি ভূমিকা রয়েছে।

image_printPrint