গ্লাসগোর পদকটি অক্ষুণ্ন রাখলেন বাকী

48
image_printPrint

গোল্ডকোস্ট (অস্ট্রেলিয়া), ৮ এপ্রিল, ২০১৮ (বাসস) : ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্য পদক জয় করেছিলেন বাংলাদেশের কৃতি শ্যূটার আব্দুল্লাহ হেল বাকী। চার বছর পর অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টে এসে গেমসের সেই পদকটি অক্ষুণ্ন রেখেছেন তিনি।
গেমসের শুরু থেকে বাকীকে ঘিরে প্রত্যাশার যে জাল বুনা হচ্ছিল তা পূর্ণ করেছেন তিনি। এবারও জিতে নিয়েছেন ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্য পদক। হতে পারত এই অর্জন আরও বড়। মাত্র ০.৪ পয়েন্ট বেশি করতে পারলে স্বর্ণ পদকই হাতে সোভা পেত বাকীর। তবে তাকে হতাশ করে ২৪৫.০ স্কোর করে স্বর্ণ জয় করেন স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার ড্যান স্যাম্পসন। আর বাকীর স্কোর ২৪৪.৭। এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পেয়েছেন ফেভবারিট ভারতের রবি কুমার। তার স্কোর ২২৪.১। মজার বিষয় হচ্ছে কোয়ালিফাইং রাউন্ডে দ্বিতীয় ছিলেন রবি। আর শীর্ষে তার স্বদেশী দীপক কুমার। স্যাম্পসন ছিলেন তৃতীয়। আর বাংলাদেশের বাকী ছিলেন ৬ষ্ঠ স্থানে।
ফাইনাল রাউন্ডে ঘুরে দাঁড়ান স্বপ্ন জয়ের নায়ক বাকী। আরেকটুকু মনোযোগী হলে হয়ত শীর্ষ স্থানটি দখলে নিতে পারতেন। অবশ্য এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ তার তো এই ইভেন্টে অংশ নেয়ারই কথা ছিল না। দেশে জাতীয় শ্যূটিংয়ে নিজের প্রিয় ইভেন্ট ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে তিনি ভালো করতে পারেননি। ফলে তার অংশ নেয়ার কথা ছিল ৫০ মিটার রাইফেলে।
কিন্তু কোচ ক্লাভস ক্রিস্টেনসেন এর মাথায় ছিল অন্য পরিকল্পনা। বাজির ঘোড়া বাকি-সেটা তিনি ভালোই জানতেন। গত দ্’ুবছর ধরে বাকীর কোচ। তিনি অন্য কাউকে নয়, চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য বেছে নেন বাকীকে। বড় আসরে বাকীর অভিজ্ঞতা আর দৃঢ়তায় আস্থা ছিল কোচের। ঢাকায় থাকা অবস্থায় বাকীকে জানানো হয়, পরিবর্তন হতে পারে তার ইভেন্টের। কিন্তু সেটি চূড়ান্ত হয় মাত্র ১ দিন আগে।
বাকীর হাত ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে পাকা। তিনি নিজেও এটিতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করেন। ফলে নিজের ইভেন্ট ফিরে পেয়ে মনের জোড় আরও বেড়ে যায় তার। তিনিও জানতে কোচের মত সারাদেশ তার দিকে তাকিয়ে আছে, পদকের আশায়। আর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, নিজের সেরাটা দিতে পারলে পদক আসবেই। হলোও তাই। চার দিকে থেকে যখন একের পর এক (বাংলাদেশের অন্য ডিসিপ্লিন থেকে) ক্রীড়াবিদের হতাশাজনক পারফরমেন্সের খবর আসছে, তখন সব চাপ যেন বাকী’র ওপর। বাকী ছিলেন স্বভাব অনুযায়ী খুবই শান্ত। কখনো লক্ষ্যচূত্য হননি। শুরুতেই চূড়ান্ত ৮ জনের টিকে থাকার লড়াই। হলেন ৬ ষষ্ঠ। তখন যেন বাংলাদেশ শ্যুটিং দলের আকাশে কালো মেঘ জমছে। কারণ তার সাথে এই ইভেন্টে অংশ নেয়া বাংলাদেশের আরেক শ্য্যূটার মো. রাব্বি হাসান মুন্না ১৮ জনের মধ্যে হন ১৪। এদিকে নিজ ইভেন্ট থেকে আরও দুই শ্যূটারের ছিটকে পড়ার খবর আসে বাকির ইভেন্ট শুরুর আগেই।
মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে বাংলাদেশের আরদিনা ফেরদৌস অল্পের জন্য ফাইনালে (৮ জনে) কোয়ালিফাইং করতে পারেননি। তিনি ২৫ জনে ৯ম হন। আর ১৭তম হয়েছেন বাংলাদেশের আরেক শ্যূটার আরমিন আশা।
ফলে শেষ ভরসা আব্দুল্লাহ হেল বাকী- এমনটা মেনে নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে বেলমন্ট শ্যূটিং সেন্টারে সবার চোখ আটকেছিল। বাকী একে একে তার লক্ষ্য ভেদ করে যান। আর বাংলাদেশও তার স্বপ্ন পুরনের দিকে এগিয়ে যায়। ৬০ শটের বাছাই পর্বে ষষ্ঠ হলেও পদক লড়াইয়ে শুরুটা করেন দৃঢ়তায়। সমান তালে আবার কখনো এগিয়ে থেকে শক্ত প্রতিদন্দ্বিতা গড়ে তুলেন অস্ট্রেলিয়ান ও ভারতীয় প্রতিযোগীর বিরুদ্ধে। ৫০.৫, ১০১.৪, ১১২.৪, ১৪৩.০, ১৬৩.৪, ১৮৩.৫, ২০৪.৮ ও ২২৪.৬ স্কোর করে অর্জন করেন রৌপ্য পদক। এর কোনোটাতে মাত্র ০.৪ পয়েন্ট বেশি স্কোর করতে পারলে বেলমন্ট শ্যূটিং সেন্টারে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠত। তা আর না হলেও বাকী দেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছেন। এ জন্য শ্যূটিং সেন্টারে উপস্থিত বাংলাদেশের শ্যূটার, কোচ ও কর্মকর্তারা সাধুবাদ জানিয়েছেন তাকে। প্রথমবারের মত ‘সাফল্যের’ ছোয়ায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান গেমস কভার করতে আসা সাংবাদিকরাও।
দেশকে পদক এনে দিতে পেরেই খুশি বাকী। রৌপ্য গলায় ঝুলিয়ে বললেন, ‘আমি জানতাম সবাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি স্বর্ণের দিকে নজর দেইনি। আমার টার্গেট ছিল পদক। সেটা পেয়েছি বলে ভালোই লাগছে। স্বীকার করলেন আরেকটুকু মনোযোগী হলে হয়ত স্বর্ণও পেতে পারতাম।
হুট করে আগের দিন ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে অংশ নেয়ার কথা জানেন বাকী। তাতে তিনি বিচলিত হন। তিনি বলেন, ‘আমাকে ঢাকাতেই ধারণা দেয়া হয়েছিল এমন কিছু হতে পারে। তাই আমি মানুষিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। যদিও আমার ফোকাস ছিল ৫০ মিটার রাইফেলে। যখন জানলাম আমি ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে অংশ নেব। তখন কিছু সময় এ জন্য অনুশীলন করি। শেষ পর্যন্ত সাফল্য এসেছে-এটাই বড় কথা।’
বাকির কাছে গ্লাসগো থেকে গোল্ড কোস্টের রৌপ্য অর্জন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘গ্লাসগো গেমসে আমার সাথে অবিনভ বিন্দ্রার তফাত অনেক ছিল। কিন্তু এবার খুবই কাছে ছিলাম। আরেকটু হলে স্বর্ণও পেতে পারতাম।’ সাথে আরও যোগ করেন, সবাই আমার দিকে তাকিয়েছিল। এটা চাপ না হলেও আমার মাথায় ছিল। সব মিলে যা হয়েছে ভালোই। আমি সন্তুষ্ট।
বাকী ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে রৌপ্য জিতেছিলেন ২০২.৩ স্কোর করে। আর স্বর্ণ জিতেছিলেন ভারতের বিন্দ্রা ২০৫.৩ মেরে।
বাকীর মত সন্তুষ্ট বাংলাদেশের শ্যুটিংয়ের কর্মকর্তারা। শ্যূটিং ফেডারেশনের মহাসচিব ইন্তেখাবুল হামিদ অপু জানান, কোচ বাকীকে নিয়ে বাজি খেলেছিলেন। তার সেই গেম প্লান সফল হয়েছে। তিনি আরও জানান, শ্যুটিং থেকে বাংলাদেশ আরও সাফল্য আশা করছেন। তার এবারের বাজির ঘোড়া শাকিল আহমেদ। তিনি কাল ১০ মিটার পিস্তলে অংশ নেবেন। ৫০ মিটার পিস্তলে অংশ নেবেন ১১ এপ্রিল।