একটি বাড়ি, একটি খামারে রঞ্জিতা রানীর অভাব জয়

439

॥ ‘হাসনাইন আহমেদ মুন্না ॥
ভোলা, ২৪ জুলাই, ২০১৮ (বাসস) : সদর উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নে’র রোহিতা গ্রামে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পে রঞ্জিতা রানী (২৮) নামের এক বিধবা নারী অভাবকে জয় করেছেন। ৩ বছর আগে স্বামী মৃনাল চন্দ্র’র মৃত্যু হলে ২ ছেলেকে নিয়ে প্রচন্ড অর্থকষ্টে থাকলেও এখন তিনি আত্বনির্ভরশীল। একটি বাড়ি একটি খামারের ‘পূর্ব রোহিতা গ্রাম উন্নয়ন’ দলের সদস্য হওয়ার পর থেকে ঘুরতে থাকে তার ভাগ্যের চাকা। এ সমিতির মাধ্যমে গত ৩ বছরে ঋণ গ্রহণ করেছেন অর্ধ লক্ষ টাকা। সেই টাকায় হোগলা পাতা কিনে বিছানা (হোগলা) তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে ফিরে পেয়েছেন হারানো স্বচ্ছলতা।
বর্তমানে ঘরে বৃদ্ধ শশুর মোনমোহন হালদার (৯০) ও ২ ছেলে অনিক চন্দ্র (১৫) ও অর্পন চন্দ্রকে (৫) নিয়ে ভালো আছেন রঞ্জিতা রানী। রঞ্জিতার দেখা দেখি রোহিতা গ্রামের অনেক নারী হোগলা পাতার বিছানা তৈরি করে বাড়তি রোজগার করছে। এছাড়া এ প্রকল্পের মাধ্যমে বহু দরিদ্র পরিবার গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতর, মাছ, সবজি পালন ও চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
সরেজমিনে রোহিতা গ্রামের রঞ্জিতার নিজ বসত বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আপন হাতে হোগলা পাতার বিছানা তৈরিতে মগ্ন রয়েছেন। বর্ষা মৌসম হওয়ায় ঘরের এক অংশে হোগলা পাতা দিয়ে পাটি তৈরির স্থান হিসাবে কাজ করছেন। ঘরের আরেক পাশে গোল গোল করে হোগলার স্তুপ করে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। পাইকাররা এখান থেকেই বিছানা কিনে নিয়ে যান। যা পরবর্তিতে জেলার বিভিন্ন হাট বাজারে ছড়িয়ে যায়। এসব হোগলার গ্রমগঞ্জে ব্যাপক কদর রয়েছে।
রঞ্জিতা রানী বাসস’কে জানান, বর্ষাকাল হওয়াতে এখন বাইরে কাজ করা যায়না। অন্য সময়ে উঠানেই বিছানা তৈরির কাজ করেন। দৈনিক একটি হোগলা ও আরেকটির অর্ধেক পর্যন্ত তৈরি করা হয়। সেমতে ২দিনে ৩টি হোগলা তৈরি করা যায়। প্রতিটি বিছানা পাইকারি দামে ৯০ থেকে ১০০ টাকা বিক্রি করেন। একেকটিতে ৬০ থেকে ৭০ টাকা লাভ থাকে তার। এছাড়া খুচরা বাজারে একটি হোগলা দেড়শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে বলে জানান রঞ্জিতা। তিনি আরো জানান, তার স্বামী মৃনাল চন্দ্র হালদার দিনমজুরের কাজ করত। ২০১৫ সালে তার মৃত্যু হলে ২ সন্তান নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখেন। নিদারুন অর্থকষ্টে চরম অভাবের মধ্যে দিন কাটাতে হয় তাদের। বাপের বাড়িতে থাকতেই রঞ্জিতার পাটি তৈরির কাজ জানা ছিলো, কিন্তু অর্থের অভাবে কাজ করতে পারেননি। পরবর্তীতে এ প্রকল্পের সদস্য হয়ে প্রথমে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেন। রঞ্জিতা বলেন, সেই টাকায় হোগলা পাতা কিনে বিছানা তৈরি শুরু করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা শুরু করেন। ভালো সাড়া পাওয়াতে তার আগ্রহ বেড়ে যায়। তার পরের বছর ঋন নেন ২০ হাজার টাকা। এরপর আর পিছনের দিকে তাকাতে হয়নি তার।
গ্রাম উন্নয়ন দলের ম্যানেজার দিলীপ কুমার রায় বাসস’কে বলেন, এক সময়ে এ দলের সবচে অসহায় সদস্য ছিলেন রঞ্জিতা। আজকে সে তার কঠোর পরিশ্রম ও আত্ববিশ্বাসে এ প্রকল্পের মাধ্যমে সবচে বেশি স্বাবলম্বি হয়েছেন। এককালীন অনেকগুলো টাকা পাওয়াতে রঞ্জিতার পক্ষে প্রচুর পরিমাণ পাতা ক্রয় করে বাণিজ্যিকভাবে বিছানা (হোগলা) বানানো সম্ভব হয়েছে। রঞ্জিতার দেখাদেখি অনেক নারী সদস্য ঋন নিয়ে হোগলা তৈরি করছেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বশির আহমেদ বাসস’কে বলেন, ‘একটি বাড়ি,একটি খামার’ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির গতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে গ্রামগুলোর প্রত্যেকটি বাড়ি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র বিন্দুতে হিসাবে গড়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগের ফলে শুধু রঞ্জিতা রানীই নয় এমন বহু নারী আজ অভাবকে জয় করে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখেছে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া নারীরা তাদের বিভিন্ন উদ্যেগের মাধ্যমে বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন পরিবারে।
রঞ্জিতার প্রতিবেশি নিলিমা রানী বলেন, রঞ্জিতার দেখাদেখি তিনিও একবছর হলো এ প্রকল্পের সদস্য হয়েছেন। শিখছেন কিভাবে পাতার হোগলা বোনন করা যায়। ইচ্ছে আছে আগামী বছর ঋণ নিয়ে এ কাজ শুরু করবেন। তাই শুধু রঞ্জিতা রানী নয়, একই গ্রাম উন্নয়ন দলের সদস্য রেখা রানী, সাথী রানী, শিখা রানী, হিরু বালা, শান্তি রানী, নির্মলী দেবী, মাধবীরাও হোগলা তৈরির কাজ করছেন। বিকল্প আয়ের মাধ্যমে পরিবারে স্বামীর পাশাপাশি নিজেরাও শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন।
প্রকল্পের সদর উপজেলা সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বাসস’কে বলেন, এ প্রকল্পের আলিনগর ইউনিয়নের রঞ্জিতা রানী একজন সফল উদ্যেক্তা। তিনি বলেন, সদরের ১৩টি ইউনিয়নে ১১৭টি ওয়ার্ডে মোট ২১২টি সমিতি চালু রয়েছে। আর মোট সদস্য রয়েছে ১০ হাজার ৫৫৯জন। এর মধ্যে পুরুষ ৪ হাজার ৫’শ ৫৯ ও নারী ৬ হাজার জন রয়েছেন। এছাড়া গত অর্থবছরে এ প্রকল্পের মাধ্যমে সদর উপজেলায় ৪ কোটি ২৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

image_printPrint