করোনা উত্তর অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় গুরুত্বারোপ

1219

ঢাকা, ৮ জুন, ২০২০ (বাসস) : করোনা উত্তর অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন আরো সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা। কারণ, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বিশ্বব্যাপী মানবপাচারের মত অপরাধ যাতে না বাড়তে পারে সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের অভিবাসী নারী শ্রমিকদের জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশ্বে বড় ধরনের সংকটে অভিবাসী শ্রমিকেরাই তুলনামূলক ভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওসহ দেশ-বিদেশের শ্রম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র দেয়া তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদী আরবসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩ জন অভিবাসী নারী শ্রমিক কাজ করছেন। মহামারী করোনাকালে গত মার্চ মাস থেকে নারী কর্মী প্রেরণ বন্ধ রয়েছে। চলতি বছর মাত্র ১৩ হাজার ৯৮২ জন নারী কর্মী বিদেশ গিয়েছেন। করোনার কারণে অনেক নারী কর্মী বিদেশে যেতে পারেননি। অনেকে আবার ফিরেও এসেছেন।
এদিকে, করোনাকালীন অভিবাসী শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা তা তারা পাচ্ছেন না। একমাত্র সিঙ্গাপুর ছাড়া কোথাও অভিবাসী শ্রমিকেরা সুরক্ষা পাননি বলে শ্রম বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
অনেক দেশেই নানা কষ্টে আছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা। তাঁদের একদিকে খাদ্যাভাব, অন্যদিকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। আবার যাঁরা করোনার আগে দেশে এসেছেন, তাঁদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ আপাতত নেই। আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যে দেশে তিনি কর্মরত সেই দেশের বলে ২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছিল।
অথচ এখন সুরক্ষা দেওয়া দূরে থাক, উল্টো ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে কয়েকজন অভিবাসী শ্রমিক বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন।
তারা জানান, করোনা পরিস্থিতিতে অভিবাসী শ্রমিকদের যথাযথ মজুরি দেয়া হচ্ছে না, তাঁদের মজুরিসহ অন্যান্য সুবিধা কাটা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এসব ঘটনা বেশি ঘটছে বলে অভিবাসী নারী শ্রমিক বিশেষজ্ঞ তাসনীম সিদ্দিকী জানিয়েছেন। বর্তমানে দেশের অভিবাসী নারী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, লেবানন, জর্ডান, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ব্রুনেই, মরিশাস ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে সিংগাপুর এবং হংকং।
এই নারী শ্রমিকগণ বিদেশে মূলত গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া, তারা গামেন্টস, বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরিতে, ক্লিনার, দোকানে বিক্রয় কর্মী ইত্যাদি পেশায় কাজ করেন। খুব সামান্য হলেও কিছু নাসির্ং পেশায় নিয়োজিত আছেন।
অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে যাঁরা দেশে ফিরে এসেছেন, তাঁরা ভীষণ সমস্যায় পড়েছেন। তাঁদের পরিবারও সংকটে পড়েছে। সরকারের খাদ্য ও নগদ কর্মসূচির আওতায় তাঁদের নেওয়া উচিত ছিল। অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী ৫০০ কোটি টাকা এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেন এমন একজন আইনজীবী এডভোকেট নজরুল ইসলাম বলেন, কর্মসংস্থানের উদ্দেশে বাংলাদেশ থেকে নারী শ্রমিকদের বিদেশে অভিবাসনের হার ক্রমাগত বাড়ছে। অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা বিধানে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকেই। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন ঘোষণা ও আইনের আলোকে গন্তব্য দেশে অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে জোর দরকষাকষি করতে হবে। এসডিজির ৮ নং লক্ষ্যে শ্রমিকদের শোভন কাজ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এছাড়াও, আবুধাবি ডায়ালগ, কলম্বো প্রসেসসহ যেসব উদ্যোগ রয়েছে সেখানে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। বাংলাদেশের চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট এর সর্বশেষ ঢাকা সম্মেলন-২০১৬ তে যে সকল সুপারিশ এসেছে সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রতারক এজেন্সি ও দালালদের বিচার ও কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিদেশে পাঠানোর পূর্বে শ্রমিকদের জন্য যুগোপযোগী ও কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
তিনি বলেন, অভিবাসী সংক্রান্ত নীতি ও আইনের উপর জনসচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে এবং দেশের সকল ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহকে এই কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগিয়ে একেবারে ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিবাসনে ইচ্ছুক শ্রমিকদের নিবন্ধন ও গন্তব্য দেশে কর্মস্থলের বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষন করতে হবে। কর্মচুক্তিসহ অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য সকল নির্দেশনা বাংলায় তৈরি করে শ্রমিকদের সরবরাহ করতে হবে। করোনা উত্তর নারী কর্মীদের বিদেশে প্রেরণের ক্ষেত্রে পাচাররোধে গন্তব্য দেশের দূতাবাসগুলোর জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়া হালনাগাদ ডাটাবেজ সংরক্ষণ, সেফহোম চালুসহ সেখানে অবস্থানকারী বাংলাদেশী নাগরিকদের কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেবিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভিবাসী কর্মীদের চুক্তি অনুযায়ী যেন শ্রমিকগণ কাজ ও মজুরি পায় তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে সরকারকেই। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরও বেশি তৃণমূলকেন্দ্রিক করতে হবে এবং এর সেবা কার্যক্রমে আরো স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করতে হবে।
জাতীয় মহিলা শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি শামসুন নাহার ভূঁইয়া এমপি বলেন, অভিবাসী শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে গন্তব্য দেশের ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। আইএলওসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গন্তব্য দেশসমূহে অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় উপযুক্ত আইন প্রণয়ন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী আইন রহিত করার জন্য বাংলাদেশকে শক্তিশালি ভূমিকা রাখতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে এবং বিদেশে কর্মরত কোটি মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়ে সরকার কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করে পরিকল্পনামাফিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।