প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নের সোপান : একটি বাড়ি-একটি খামার প্রকল্প

448
image_printPrint

॥ জয়শ্রী জামান ॥
ঢাকা, ১৫ জুলাই, ২০১৮ (বাসস) : গোলা ভরা ধান পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু-এই ছিল একদা আবহমান বাংলার এক চির চেনা রূপ। কৃষিভিত্তিক বাংলার প্রাণ কৃষক ফসল ফলান, আবার কাছের ডোবা, পুকুর জলাশয়ে মাছ চাষ করেন, উঠানেই পালিত হয় হাঁস-মুরগি, গোয়ালে ছাগল ও গরু। আঙ্গিনায় শাক-সবজি চাষ তো স্বভাবগত। তবে পারিবারিক খামার গড়ার স্বপ্ন সবার থাকলেও পুঁজির অভাবে অনেকেই তা পেরে ওঠেন না। এসব প্রান্তিক মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ উচ্চারণ,‘আমরা শত্রুকে মোকাবিলা করে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। এখন আমাদের যে যুদ্ধ সেটা হচ্ছে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।’ আর সেই লক্ষেই ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প।
গ্রামের প্রতিটি দরিদ্র পরিবার যাতে মাছ, সবজি, হাঁস-মুরগী ডিম দুধ বিক্রি করে তাদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত পণ্য বিক্রি করে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারে সেজন্যেই এ প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে গ্রামে গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে একেকটি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি। দরিদ্র সদস্যরা প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা এই সমিতিতে জমা করেন। সরকার সমিতির ব্যাংক হিসাবে সমপরিমাণ টাকা সহায়তা দেয়। এভাবে প্রতিটি সমিতির দরিদ্র সদস্যদের জন্য স্থায়ী তহবিল ও সরকারের ঋণ কাজে লাগিয়ে আত্ম-উন্নয়নে আয় বর্ধক উদ্যোগ গ্রহণ করে ভাগ্য বদলের সুযোগ পেয়েছে গ্রামীণ প্রত্যন্তÍ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ। পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ পরিবারগুলো তার অবস্থার উন্নয়ন করতে পাড়লে সমৃদ্ধশালী হবে বাংলাদেশ।
উপকারভোগী দেবীগঞ্জের লাইলী বেগম বাসসকে জানান, বসত ভিটা ছাড়া কোনো জায়গা তার নেই, তার স্বামী নূর হোসেন মানুষের বাড়িতে কামলার কাজ করতো। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসারে অভাব লেগেই থাকতো। তিনি বলেন, আমি দেবীধস গাছপুরি গ্রাম উন্নয়ন সমিতির একজন উপকারভোগী জানান, আমি ২০১৪ সালে সমিতি থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেই। জমিতে চুক্তি নিয়ে আলু লাগাই। আলু বিক্রি করি ৪৫ হাজার টাকার। সেই টাকা দিয়ে এক বিঘাজমি বন্ধক রাখি। জমি থেকে উপার্জিত আয় ও ঋণের টাকা দিয়ে আরো এক বিঘা জমি বন্ধক রাখি। কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করি। এবং আবারো ঋণ নেই ১৫ হাজার টাকা। এই ঋণ এক বছরে ঠিক মতো শোধ করি। তৃতীয় বছরে ঋণ নেই ২০ হাজার টাকা। এবং চতুর্থ অর্থাৎ ২০১৭ সালে এ প্রকল্প থেকে ঋণ নেই ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে আমার দুবিঘা জমি ও ছয়টি গরু আছে।
বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার বাঘার গ্রাম উপজেলার উপকারভোগী কনক হালদার জানান, তিনি বাঁশ বেত সামগ্রী তৈরী করে স্বাবলম্বি হয়েছেন।
স্বাবলম্বী হয়েছেন মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি ইউনিয়নের পুরাতন মদনাডাঙ্গা গ্রামের বুদ্ধি প্রতিবন্ধি অতিদরিদ্র দোয়াত আলীর স্ত্রী। ২০১৩ সালে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছাগল পালন শুরু করে। পরে ১৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে নিজস্ব টাকা মিলিয়ে গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৫ সালে সেই গরু ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা লাভ করেন। পরবর্তীতে পুনরায় ২৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নিজস্ব ২৫ হাজার টাকা যোগ করে দুইটি গরু কেনেন। বর্তমানে সেই গরুর দাম এক লাখ ৫০ হাজার টাকা।
স্থানীয় প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদের সর্বেত্তম ব্যবহার নিশ্চিত, দরিদ্র পরিবারকে পুঁজি গঠনে সহায়তা করা, প্রয়োজনের নিরিখে জীবিকায়ন নিশ্চিত করা, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে সম্পৃক্ত করা, দক্ষ মানব সম্পদ ও কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা, উন্নয়নে নারীর অংশিদারিত্ব নিশ্চিত করা , নারীরক্ষমতা নিশ্চিত করা সর্বোপরি দরিদ্র্য জনগোষ্ঠির স্থায়ী তহবিল গঠন করে আয় বর্ধক করা। সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক ও টেকসই ভূমিকা রাখতেই- এই প্রকল্প।
কেবল লাইলী বেগম কনক হালদার ও রামিচা খাতুনই নয় সাম্প্রতিক বাংলাদেশ প্রেস ইনসটিটিউটের এক হ্যান্ড বুক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে এ প্রকল্পের প্রত্যক্ষ উপকারভোগীর সংখ্যা ১ কোটি ২২ লাখ। উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ, ৭০ হাজার ৮৯৪। বছরে প্রকল্পভুক্ত পরিবারের আয় বৃদ্ধি ১১ হাজার টাকা। সারা দেশে এই প্রকল্পের আওতায় গড়ে উঠেছে ৫৪ হাজার ৩৯৭টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি ।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশ প্রেস ইনসটিটিউটের এক হ্যান্ড বুক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১৬ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার কয়েক বছর আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্য বিমোচনে এই কার্যক্রমকে স্থায়ী রূপ দেয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবর এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়।
একটি বাড়ি ও একটি খামার প্রক্রিয়াটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, জেলা প্রশাসক ও তার কার্যালয় বাস্তবায়ন করে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বি আরডিবি০ ও অন্যান্য বিভাগ, যেমন সমবায় বিভাগ, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বিএআরডি), কুমিল্লা পিডিবিএফ, এসএফডি এফ এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমি প্রধান সহায়তাকারী।
এই প্রকল্প শুরু হয় জুলাই ২০০৯ থেকে। এই পর্যন্ত প্রকল্পের অধীনে সঠিক সমিতির সংখ্যা ১৫,৩৩৭টি, মোট সমিতি গঠনের লক্ষ্য ৬০, ৫১৫টি। এ পর্যন্ত সমিতির সদস্য সংখ্যা ৫,৭৭,১১০ জন, সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩৬,৩০,৯০০জন। এ পর্যন্ত সদস্যদের জমানো টাকার পরিমাণ, ১১,৫৪,৮২,৫৭৩ টাকা। ( ৯ মে ২০১৭ পর্যন্ত তথ্য)।