নাটোর চিনিকল ইটিপি ব্যবহার করছে

298

নাটোর, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০(বাসস) : নাটোর চিনিকল বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র (ইটিপি) ব্যবহার করছে। ২০১৭-২০১৮ এবং পরের আখ মাড়াই মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে ইটিপি চালু করা হয়। ফলে শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নারদ নদে আর দূুষণ ছড়াচ্ছে না নাটোর চিনিকল। পরিবেশ থাকছে সুরক্ষিত।
দেশের সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের জন্যে পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দূুষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় অন্যতম বাংলাদেশ। দেশে প্রতিবছর ২৮ শতাংশ মানুষ মৃত্যুর শিকার হচ্ছে-পরিবেশ দূুষণজনিত বিভিন্ন অসুখে।
উন্নয়নের পথে দ্রুত ধাবমান বাংলাদেশে শিল্পায়নের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এ- স্থাপিত শিল্প-কারখানা পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও ঐসব কারখানার মাধ্যমে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। কারখানার তরল বর্জ্য যাচ্ছে পাশের নদীতে অথবা মাটিতে। ধ্বংস হচ্ছে নদীর মাছ, জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদ। দূুষণের শিকার মাটির উর্বরতা শক্তি কমছে, কমছে ফলন। ফলে মারা যাচ্ছে কেঁচোসহ উপকারী সব অনুজীব।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী ভারী বা মাঝারী শিল্পে বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র বা ইটিপি স্থাপন ও ব্যবহার করা বাধ্যতামূুলক। কিন্তু নিয়ম না মানাটাই যেন আমাদের দেশে নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাই নদীমাতৃক এ দেশের নদীগুলো প্রাণ হারাচ্ছে শিল্পের দূুষণ আর দখলে। ব্যতিক্রম নয় নাটোর শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নারদ নদ। নারদের পাশে গড়ে ওঠা শিল্পগুলো যুগ যুগ ধরে নারদের প্রাণ হরণ করছে। ব্যতিক্রম শুধু নাটোর চিনিকল। শুধু নারদের পাশের শিল্প হিসেবেই নয় দেশের ১৫টি রাষ্ট্র্রায়ত্ত চিনিকলের মধ্যে একমাত্র নাটোর চিনিকল ইটিপি স্থাপন করেছে। সর্বক্ষণ ব্যবহারের ফলে গাঁদযুক্ত পানি পরিশোধিত হয়ে যাচ্ছে নারদে। নদের পানি থাকছে দূুষণমুক্ত।
নাটোর চিনিকল সূত্রে জানা যায়, ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নাটোর চিনিকলে ইটিপি নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আয়ন এক্সচেঞ্জ দুই বছর ধরে নির্মাণ কাজ শেষ করে। কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানির পর্যায়ক্রমিক জলাধার থেকে পানির সরবরাহ বিশেষ যন্ত্রে চুন, পলিএ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড, পলিমার ইত্যাদি রাসায়নিক মিশ্রিত করে দূুষণমুক্ত করা হয়। চারটি জলাধার পেরিয়ে পরিশোধিত পানি যাচ্ছে নারদ নদে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে চলছে এ কর্মযজ্ঞ।
২০১৭-২০১৮ এবং এর পরবর্তী আখ মাড়াই মৌসুমে পরীক্ষামুলকভাবে ইটিপি চালু করা হয়। নাটোর চিনিকল কর্তৃপক্ষ নাটোর চিনিকলের অপরিশোধিত এবং ইটিপি’তে পরিশোধিত পানি পরীক্ষার জন্যে নমুনা পাঠায় পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় বগুড়াতে। বিভিন্ন মানদন্ডে পরীক্ষা শেষে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক মোঃ আশরাফুজ্জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানানো হয়েছে।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দুই বছর আগে ইটিপি নির্মাণ কাজ শেষ করলেও অদ্যাবধি চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাছে ইটিপি হস্তান্তর করেনি। চিনিকল কর্তৃপক্ষের নিকট ইটিপি হস্তান্তর এবং পানি পরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রদান করা প্রয়োজন। কারণ নাটোর চিনিকলের কারখানা বিভাগে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ল্যাবরেটরি রয়েছে, রয়েছেন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কেমিস্ট। এ ল্যাবরেটরিতে অনায়াসে ইটিপি পরিশ্রুত পানি পরীক্ষা করা সম্ভব বলে জানালেন নাটোর চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (কারখানা) মোঃ নূরে আলম।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আয়ন এক্সচেঞ্জ এর এডভাইজর মাসুদুর রহমান জানান, নির্মাাণ শেষে ইটিপি চালুর পরে এর পরীক্ষামূলক ফলাফল খুবই ভালো। ইটিপি খুব দ্রুত চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে হস্তান্তর করা হবে।
নাটোর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এফ এম জিয়াউল ফারুক বলেন, ইটিপি পরিশ্রুত পানি আবারো পরীক্ষা করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইটিপি’র হস্তান্তর গ্রহণ করা হবে। দেশের ১৫টি রাস্ট্রায়ত্ত চিনিকলের মধ্যে শুধুমাত্র নাটোর চিনিকলই ইটিপি ব্যবহার করছে। উৎপাদনের মাধ্যমে উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পরিবেশকে সুরক্ষা প্রদানে এ ইটিপি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
নাটোরের জেলা প্রশাসক মোঃ শাহরিয়াজ বাসস’কে বলেন, শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নারদ নদকে দূুষণ ও দখলের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনিক কার্যকর পদক্ষেপ চলমান আছে। এক্ষেত্রে রাস্ট্রায়ত্ত নাটোর চিনিকলের ইটিপি প্রতিস্থাপনসহ এর নিয়মিত ব্যবহার অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্যে অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

image_printPrint