প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র

612

নাটোর, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ (বাসস) : প্রতিবন্ধী শিশুরা এ সমাজেরই অংশ। নিয়মিত সেবা ও সাহায্য পেলে তারাও ফিরে আসতে পারে সমাজের মূল ধারায়। প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে নাটোরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র। তাদেরকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিনামূল্যে চিকিৎসার মাধ্যমে জীবনের মূলধারায় নিয়ে আসতে কাজ করে যাচ্ছে কেন্দ্রটি। ইতোমধ্যে দুই হাজারের অধিক শিশুকে বিনামূল্যে প্রায় ৩৮ হাজার সেবা প্রদানের মাইলফলক স্পর্শ করেছে এই কেন্দ্র। পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদে সেবা পৌঁছে দিচ্ছে থেরাপী ভ্যান, প্রতিবন্ধীদের মাঝে বিতরণ করছে সহায়ক উপকরণ।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত সারাদেশে ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের মধ্যে নাটোর শহরের বড় হরিশপুর এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী এই কেন্দ্রটি অন্যতম। মে ২০১২ স্থাপিত কেন্দ্রটিতে এ পর্যন্ত নিবন্ধনকৃত চিকিৎসা গ্রহীতা শিশুর সংখ্যা দুই হাজার ২১৪ জন। এসব শিশুরা ১২টি পর্যায়ে প্রায় ৩৮ হাজার সেবা গ্রহণ করেছে। শিশুদের পাশাপাশি নারী ও পুরুষরাও সেবা গ্রহন করছেন।
একজন ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্ট, একজন ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিষ্ট, ২ জন করে থেরাপী সহকারী ও টেকনিশিয়ানসহ ১০ দক্ষ জনবলে এই কেন্দ্রে ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পীচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং স্পীচ প্যাথলজি সেবা প্রদান করা হয়। শনিবার থেকে বুধবার- ৫ কর্ম দিবসে ৯ টা হতে ৫ টা পর্যন্ত সময়ে অটিজম, শারীরিক প্রতিবন্ধী, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অসু¯্য’তাজনিত প্রতিবন্ধী, বাক প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রম ইত্যাদি অসুস্থতা জনিত শিশু এবং নারী-পুরুষদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি, আই.এফ.টি, টেন্স, ই.এম.এস, এস.ডাব্লিউ.ডি, আই.আর.আর, ট্রাকশন সেটসহ মোট ৭৫টি আধুনিক যন্ত্রপাতির ২টি করে সেট সহযোগে শিশুসহ সেবা গ্রহীতারা এই কেন্দ্রে বিনামূল্যে সেবা পাচ্ছেন।
নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন সেবা গ্রহীতার প্রত্যেকেই ২ থেকে ৩টি বিষয়ে সেবা গ্রহণ করে থাকেন। তবে স্পীচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপি সেবা গ্রহণের আধিক্যের কথা জানিয়ে টেকনিশিয়ান সাদিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন এই দুইটি বিষয়ে সেবা গ্রহীতার সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ জন। থেরাপি সহকারী মাহমুদা খাতুন জানান, ইলেকট্রিক থেরাপি ও এক্সারসাইজ নিতে এই কেন্দ্রে উল্লেযোগ্য সংখ্যক রোগী আসেন।
নাটোরের গুরুদাসপুরের মহারাজপুরের কৃষক আব্দুল্লাহ ও গৃহিনী শিউলী বেগমের দ্বিতীয় ছেলে সামি। জন্মের পর কিছু সমস্যা নিয়ে সে এক সপ্তাহ হাসপাতালে ছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাবা-মা লক্ষ্য করলেন, সামি অন্যান্য বাচ্চাদের মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে না। যে বয়সে সামির ঘাঁড় শক্ত হওয়ার কথা, বসার ও হাটার কথা, কথা বলার কথা, অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলাধূলার কথা, সে বয়সে সে বিছানায় শুয়ে নিষ্প্রাণ সময় কাটাচ্ছে। নাম ধরে ডাকলে কিছু সময় পরে উত্তর দেয়াসহ বুদ্ধিগত সমস্যা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন বাবা-মা। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন চিকিৎসা দেওয়ার পরও কোন উন্নতি না দেখে হতাশ হয়ে পড়েন তাঁরা, হয়ে পড়েন আর্থিকভাবে নিঃস্ব। অবশেষে খোঁজ পেয়ে নাটোরের প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয় সাড়ে পাঁচ বছর বযসী সামিকে। কেন্দ্রের চিকিৎসা পরিকল্পনায় সামিকে দেওয়া হয় ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, এবং স্পীচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি। ফিজিওথেরাপিতে সামিকে ঘাঁড়ের এক্সারসাইজ,স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ, ব্যালেন্সিং এক্সারসাইজ করানো হয়। অকুপেমনাল থেরাপিতে তাকে গ্রস মটর ও ফাইন মটর কার্যক্রম, এডিএল প্রাকটিস শেখানো হয়। স্পীচ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিতে সামির যোগাযোগ দক্ষতা, ভাবের আদান-প্রদান, মুখ থেকে লালা পড়া এবং ভাষাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অভিভাবকদের জন্যে চলে কাউন্সিলিং। বিনামূল্যে থেরাপি চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিবন্ধীতা উত্তরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে আসতে শুরু করেছে সামি।
অটিজমে আক্রান্ত শিশু অনুরাগ ঘোষ এই কেন্দ্রে ৬ মাসের চিকিৎসা নিয়ে কথা বলতে পারে, হাঁটা চলা করতে পারে, পোশাক পরতে পারে বলে জানালেন তার বাবা তপন কুমার ঘোষ। মা সুনন্দা রাণী ঘোষ বললেন, অনুরাগের জেদ একটু বেশী, তাই পড়াশুনা করাতে ওর পেছনে লেগে থাকি। অনুরাগ নাটোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ছোট্ট মহিমা, সাবিহার মত শিশুদের অভিভাবকরা এই সেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে স্বস্তি ফেরার কথা জানালেন।
কেন্দ্রের ফিজিওথেরাপি কনসালটেন্ট নাসরিন সুলতানা নীলা বলেন, নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর সেবা গ্রহীতার সেবা গ্রহণের চাহিদা নিরূপণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এরপর শুরু হয় সমন্বিত চিকিৎসা সেবা প্রদান প্রক্রিয়া। রোগী ও অভিভাবকদের জন্য কাউন্সিলিং এবং গ্রুপ স্টাডিও থাকে আমাদের চিকিৎসা সেবায়।
কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ভক্ত প্রসাদ দাস বলেন, শুধু বিনামূল্যে চিকিৎসা নয়, চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবন্ধীদের মাঝে সহায়ক উপকরণও বিতরণ করে এই কেন্দ্র। এ পর্যন্ত ৩২৩টি হুইল চেয়ার, ৩৮টি স্ট্যান্ডিং ফ্রেম, ৩১টি ট্রাই-সাইকেল, ৮১টি হিয়ারিং এইড এবং ৬৫টি সাদাছড়ি, ১৫টি এলবো ক্রাচ, ১০টি অক্সিলারী ক্রাচ, ৯টি টয়লেট চেয়ার, ৭টি করে কর্ণার চেয়ার, ওয়াকার রোলেটর ও ফোল্ডিং ওয়াকার বিতরণ করা হয়েছে।
চলমান রয়েছে অত্যাধুনিক থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসা সেবা ক্যাম্পেইন কার্যক্রম। এই ক্যাম্পেইন কার্যক্রমে থেরাপি ভ্যান থেকে এ পর্যন্ত জেলার ৩১টি ইউনিয়নের ১২০টি ক্যাম্পে ছয় হাজার ১২৩ রোগীকে ১৬ হাজার ৩৫৫টি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে এবং চাহিদা সম্পন্ন রোগীদের নাটোর কেন্দ্রে চিকিৎসা সেবা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান কেন্দ্রের প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা।
২০১৭ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে প্রতিবন্ধী সেবা কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ১০ শয্যার আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। দূরের শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে ঐ চিকিৎসাকে সম্পন্ন করতে আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরী বলে মত প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা।
বিগত সাত বছর ধরে প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদানের মধ্য দিয়ে জীবনের মূলধারায় নিয়ে আসতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে নাটোরের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রটি। এভাবে উপকৃত হচ্ছে হাজারো পরিবার, সমাজ, সর্বোপরি রাষ্ট্র।

image_printPrint