প্রসবপূর্ব ও পরবর্তী সেবায় অবদান রাখছে কমিউনিটি ক্লিনিক

136

ঢাকা, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ (বাসস) : মাত্র পাঁচ মাস আগেই মা হয়েছেন সুলতানা। উচ্চশিক্ষিত সুলতানা নিজেই এ ব্যাপারে অনেক সচেতন। কিন্তু ডেলিভারির সময় একেবারে মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলেন তিনি। সুলতানা জানান, ডেলিভারির সময় প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তার। ডাক্তার কোনভাবেই বন্ধ করতে পারছিলেন না। আর তাই প্রচুর রক্তের প্রয়োজন হয়। শুরুতে ডাক্তার সিজারের মাধ্যমে বাচ্চা বের করে নেয়। না হলে বাচ্চাও অসুস্থ হয়ে যেত। কিন্তু এরপর থেকে আর ব্লিডিং বন্ধ হচ্ছিল না। ভাগ্য সহায় ছিল দশজন ব্লাড ডোনার রেডি ছিল। একের পর এক রক্ত দেয়া হচ্ছিল আমাকে। সাত ব্যাগ রক্ত দেয়ার পাশাপাশি ডাক্তার এবং নার্সদের অক্লান্ত চেষ্টার ফলে বেঁচে যাই।
কিন্তু সব মায়ের ভাগ্য সুলতানার মত নয়। অনেক মা’ই সন্তান জন্মদানের সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। তবে পরিসংখ্যান বলছে আগের চেয়ে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে এসেছে। আর যেসব মায়েরা সন্তান জন্মদানের সময় অথবা শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে তার প্রধান এবং অন্যতম কারন হচ্ছে সচেতনতার অভাব। একটু সচেতন হলেই সম্ভব পুরোপুরি মাতৃ মৃত্যু হার একেবারে কমিয়ে আনা এবং এ বিষয়ে সাফল্য অর্জন করা।
বিশিষ্ট গাইনোলজিস্ট ডা. রোকেয়া হক বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের মাতৃ মৃত্যুর হার ৭০ এ নামিয়ে আনতে হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশুর মধ্যে ১৭২ জন মৃত্যুবরণ করে। ৩৭ শতাংশ মা প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি হয় ৪৭ শতাংশ। আর প্রসব পরবর্তী সেবা গ্রহণ করেন ৭৩ শতাংশ নারী। প্রসবজনিত জটিলতার কারণে দেশে এখনও প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৫ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার।
তিনি বলেন, দেশে মাতৃ মৃত্যুর প্রধান কারণ রক্তক্ষরণ এবং খিঁচুনি। খুব স্বল্প মূল্যের ওষুধ দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমাদের অবশ্যই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর স্বাস্থ্য সেবাকে মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছানোর জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি সেসব সেবা গ্রহণ করতে না চায় এবং সচেতন না হয় তবে একা সরকারের পক্ষে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো সত্যিই কঠিন।
তিনি বলেন, এখন দেশে প্রায় ১৩ হাজারের বেশী কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব ক্লিনিকে বিনা মূল্যে প্রসবপূর্ব এবং প্রসব পরবর্তী সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়াও অনেক ক্লিনিকে প্রসুতি সেবাও দেয়া হচ্ছে। রাখা হয়েছে ডেলিভারির ব্যবস্থা। কিন্তু এসব জানার পরও অনেক পরিবার বাড়িতেই সন্তান প্রসব করায়। আর এরফলে মারা যাচ্ছে মা।
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে একটি পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। যাতে করে একজন মা’ও যেন অকালে মৃত্যুবরণ না করে।
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার চিউবতলী বাজার কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সেবা নেয়া সন্তান সম্ভবা মা শান্তি চাকমা বলেন, আমি প্রতিনিয়ত এখানে এসে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করি। এখানে বিনামূল্যে ওষুধও দেয়া হয়। সরকার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমাদের দিচ্ছে। কিন্তু আমরা সেটা গ্রহণ করতে পারছি না। এর পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করে। একটি হচ্ছে সচেতনতার অভাব আর অন্যটি কুসংস্কার।
তিনি বলেন, আমাদের পাড়ায় এমন কিছু পরিবার রয়েছে যারা কখনোই ডাক্তারের শরণাপন্ন হন না। এমনকি তাদের বাড়িতে এখনো পর্যন্ত সন্তান প্রসব করানো হয় এলাকার এক বয়স্ক ধাই মাকে দিয়ে। আমাকেও অনেকে পরামর্শ দিচ্ছে যাতে করে আমিও ওনার কাছে সেবা নিই।
কিন্তু আমি আর আমার স্বামী বলে দিয়েছি সন্তান প্রসবের আগে আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হব। সেখানেই আমার সন্তান জন্ম নিবে।

image_printPrint