সময়মতো চিকিৎসায় শিশুর অন্ধত্ব প্রতিরোধ সম্ভব

211

ঢাকা, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ (বাসস) : লাবনীর বয়স মাত্র নয় বছর। এই অল্প বয়সেই মেয়েটি খুব গোছালো। বাবা-মা যাই বলে তাতেই তার সম্মতি। অন্য বাচ্চাদের মত তার তেমন কোন বায়নাও নেই। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যায়। আর স্কুল থেকে ফিরে কিছুক্ষণ টিভিতে কার্টুন দেখে। তারপর গোসল সেরে খেয়ে নেয়। এরপর ঘুম। বিকেলে ঘুম, থেকে উঠে বই নিয়ে পড়তে বসা। এ যেন তার নিয়মিত কাজ।
কিন্তু ক’দিন হলো মেয়েটি মা’কে এসে বলছে শ্রেণী কক্ষে পিছনে বসলে সে ব্ল্যাক বোর্ডে শিক্ষকের লেখা ভালভাবে দেখতে পায় না। মা শুরুতে পাত্তা না দিলেও একদিন লাবনীর শ্রেণী শিক্ষক ফোন করে জানায় বিষয়টি। তারপর দিন লাবনীর মা তাকে নিয়ে যায় নগরীরর ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। সেখানে চোখের পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে জানা যায়, লাবনীর চোখে ছানি।
মাত্র ছয় মাস সতের দিনে জন্ম হয় মিথিলার। জন্মের পরপরই রাখা হয় ইনকিউবেটরে। জন্মের সময় ওজন ছিল মাত্র ১১২০ গ্রাম। জন্মের একদিন পরই ধরা পড়ে জন্ডিস। এভাবে প্রায় দেড় মাস নগরীরর দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাসায় নিয়ে আসা হয় মিথিলাকে। বাসার আনার সময় একজন সেবিকা বলেছিলেন চোখের এবং কানের ডাক্তার দেখানোর কথা। কোথায় দেখাব জানতে চাইলে সেই নার্স মিথিলার বাবা-মা’র হাতে এক ডাক্তারের ঠিকানা ধরিয়ে দেন। বাসায় আনার পর মিথিলার বাবার আর্থিক অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে সেই মাসে আর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারেননি। ভেবেছিলেন হয়ত আর কিছুদিন পরও দেখানো যাবে। কারন ডাক্তার বা নার্স কেউ জোর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেননি।
পরের মাসে মিথিলার বাবা বেতন পাওয়ার পরদিনই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। সেদিন অনেক্ষন দেখার পর তিনি আরো এক সপ্তাহ পর তার আরেক চেম্বারে যাওয়ার কথা বলেন। এক সপ্তাহ পর সেখানে গেলে বেশ কয়েকজন ডাক্তার মিথিলার চোখ পরীক্ষা করেন। এরপর তারা মিথিলার বাবাকে বলেন, আমরা ঠিক বুজতে পারছি না। সেই ডাক্তার তাকে ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই দিনই মিথিলাকে নিয়ে যান সেখানে। ডাক্তার সামান্য দেখেই বুঝে যান যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়েই গেছে। এখন আর বাংলাদেশে কিছুই সম্ভব নয়। তখন কর্তব্যরত ওই ডাক্তার যত দ্রুত সম্ভব তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কারন মিথিলার রেটিওনাপ্যাথী অব প্রি-ম্যাচিউরিটি সংক্ষেপে ‘আরওপি’ বলা হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ছয় কোটি শিশু। আর মোট জনসংখ্যার মধ্যে অন্ধত্বের সংখ্যা প্রায় সাড়ে আট লাখ। আর এরমধ্যে শিশুর সংখ্যা অর্থাৎ অন্ধ শিশুর সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজারের কাছাকাছি।
চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফুর রহমান বলেন, শিশুদের বিভিন্ন ধরনের চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেক শিশু চোখের কাছে নিয়ে বই পড়ে, কাছে গিয়ে টিভি দেখে, পেছনে বসলে ক্লাসের বোর্ড দেখতে পায় না। এসব সমস্যা হলে চশমা ব্যবহার করেই স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়াও অনেক শিশুর চোখে ছানি হতে পারে। ছানি রোগ হলেও ভয়ের তেমন কিছু নেই। কারণ ছানি সহজেই অপারেশন করা যায়।
তিনি বলেন, অনেক বাচ্চার চোখ টেরা হয়। এতে করে চোখের দৃষ্টি শক্তি কমে যেতে থাকে। এসব টেরা চোখের অপারেশন করে যত দ্রুত সম্ভব সোজা করা উচিত। এছাড়াও আঘাতজনিত কারণেও অনেক সময় চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
রেটিনা বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুন নাহার বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে শিশু অন্ধত্বের প্রধান কারণ হচ্ছে ভিটামিন-‘এ’ এর অভাব। অনেক বাবা-মা’ই শিশুদের খাবারে ভিটামিন‘এ’ যুক্ত খাবার রাখেন না। এটা তারা করেন অজ্ঞাত এবং অসচেতনতাবসত। মূলত শিশুদের খাবারের মধ্যে সব ধরনের ভিটামিনের খাবার যুক্ত করতে হয়।
তিনি বলেন প্রতিবছর হাজারো শিশু অন্ধ হয়। সময়মতো চিকিৎসা করে এ অন্ধত্বের প্রতিরোধ করা সম্ভব।

image_printPrint