গৃহবধূ পারভিন এখন স্বাবলম্বী

742

ঢাকা, ২১ জুন, ২০১৮ (বাসস) : গৃহবধূ পারভিন জীবন যুদ্ধে কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলে সমাজে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ময়মনসিংহ জেলার ফারুকের সঙ্গে পারভিনের ৮ বছর পূর্বে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে তাদের সংসারে ছিল অভাব-অনটন। অভাবের কারণে সংসারে ছিল শুধুই অশান্তি। স্বামী ফারুক একদিন কাজ করে দু’দিন বসে থাকে। দিন মজুরি করে ফারুক যা আয় করে, তা দিয়ে জুয়া খেলে প্রতিদিন ঘরে ফেরে। যার জন্য ঝগড়া-মারামারি ছিল নিত্যসঙ্গী। তাদের ঘরে তিন ছেলে-মেয়ে। ছেলে-মেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঠিকমতো খাবার দিতে না পারায় সংসারে নেমে আসে দুর্বিষহ যন্ত্রণা। সংসারে রোজগার না থাকায় তারা ঠিকমতো ছেলে-মেয়েদের জামা-কাপড় দিতে পারতো না।
স্থানীয় একটি এনজিও ২০১০ সালে ঋণ প্রকল্পের কাজ শুরু করে। দরিদ্র মহিলাদের নিয়ে ইউনিটের প্রথম দল গঠন করে ‘প্রীতি মহিলা সমিতি’। মুসলমান এবং ১২ জন হিন্দু মহিলা সদস্যা নিয়ে ৩২ সদস্য বিশিষ্ট দলের এক সদস্যা পারভিন। সেখান থেকেই শুরু সংগ্রামী জীবন। প্রথম পর্যায়ে তিনশ’ টাকা সঞ্চয় দিয়ে তিন হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে। পরিকল্পনা সঠিকভাবে করতে না পারায় ঋণের টাকা সবই সংসারে ব্যয় হয়। পরে অনেক কষ্টে এক বছরে কিস্তির মাধ্যমে ঋণের টাকা শোধ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে চার হাজার টাকা ঋণ নেয়। ঋণ নিয়ে পারভিন ধানের জমি বন্ধক নেয়। এই জমির ধান দিয়ে কোন রকমে সংসারে চলে যায়। আবার তৃতীয় পর্যায়ে দশ হাজার টাকা ঋণ নেয়। এই টাকা দিয়ে একটি গাভী ক্রয় করে। গাভীর দুধ বিক্রি করে ঋণের কিস্তি চালায়। স্কুলে ভর্তি করে দেয় ছেলে-মেয়েকে। ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুলে যায়। একটি গাভী থেকে পারভিনের এখন ৫টি গাভী হয়েছে। তাদের সংসার ভালই চলছে। পূর্বের ঋণের টাকা পরিশোধ করে চতুর্থ বার ঋণ নেয় ১৫ হাজার টাকা এবং পঞ্চম বার ঋণ নেয় ২০ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে আর একটি গরু বিক্রি করে পারভিন জমি ক্রয় করে। জমি থেকে ফসল আসে। বর্তমানে সংসারে কোন সমস্যা নেই। ষষ্ঠবার ঋণ নেয় ৩০ হাজার টাকা। এই টাকা এবং ২টি গরু বিক্রির টাকা দিয়ে আবার জমি ক্রয় করে। বন্ধকী এবং ক্রয়কৃত জমি মিলে তার বর্তমান জমির পরিমাণ হয়েছে প্রায় ৩ বিঘা।
ইউনিয়ন তথ্য সেবার মাধ্যমে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তাদের জমিতে ধান, আলু, বেগুন, পটল ও সীম চাষাবাদ করে। কখন বীজ বপন করতে হয়, কখন জমিতে সার দিতে হয়, এসব সবজিতে পোকা-মাকড় হলে তা কিভাবে নিবারণ করতে হয়, ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রের পরামর্শে সময় মতো সার, পোকা-মাকড় নিবারণের ওষুধ দিয়ে পারভিন তার স্বামীকে নিয়ে মাঠে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে এখন আলোর মুখ দেখতে পারছে।
পারভিন ধানী জমিতে ধান চাষ করে যা পায় এতেই সংসার চলে যায়। আর সবজি চাষ করে বিক্রির মাধ্যমে অনেক টাকা আয় হয়। তাদের সংসারে আর অভাব-অটন নেই। তারা এখন ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঠিকমতো পেট ভরে খাবার খেতে পারে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারছে। তারা এখন আরো জমি ক্রয় করতে পারছে। তাদের জমি এখন ৫ বিঘা। এজন্য এলাকার অনেক লোক তাদের পরামর্শ নিতে আসে।
পারভিন এখনও স্বামীর সঙ্গে মাঠে কাজ করে। এখন সংসারে খাওয়া-পরার জন্য অশান্তি নেই। ছেলে-মেয়েরা সবাই ঠিকমতো লেখাপড়া করছে। বড় মেয়ে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। লেখাপড়ার পাশাপাশি বড় মেয়ে শিউলি একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করে। বড় ছেলে কাশেম ৯ম শ্রেণীতে ও ছোট ছেলে রানা ৫ম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। ছেলে-মেয়েদের ইচ্ছা, তারা আর নিচু হয়ে সমাজে বাস করবে না। লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে চায়।
এক সময় পারভিন দারিদ্র্যতা ও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে সমাজের কাছে মাথানত করে চলতো। এখন সে মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছে। তার স্বামী ফারুক আর জুয়া খেলে না। সে এখন সবাইকে জুয়া না খেলার জন্য উৎসাহিত করে। অনেক পরিবার তাদের কাছে পরামর্শ নেয়ার জন্য আসতে শুরু করেছে। তারা জানতে চায়, কিভাবে পারভিন ও তার স্বামী ফারুক সংসারে সংগ্রাম করে আর্থিকভাবে উন্নতি লাভ করলো। তারাও সেই পথ ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। এসব কারণে এলাকার মাঝে পারভিনের অনেক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
স্থানীয় কৃষি অধিদফতরের সহযোগিতায় পারভিন জমিতে ভালো ফসল ফলানোর জন্য পরামর্শ নিচ্ছে। কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মী ও কর্মকর্তারা পারভিনকে উৎসাহ দিচ্ছে। একইভাবে পারভিন পশু সম্পদ অফিসের পরামর্শে গাভী পালনের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ বা পদ্ধতি গ্রহণ করছে। ফলে তার গাভীর রোগ-বালাই নেই বললেই চলে।
পারভিনের স্বপ্ন ছেলে-মেয়েদের ঠিকমতো লেখাপড়া শেখাবে, তাদের মানুষের মতো মানুষ করবে। এজন্য পারভিনের পবিরার স্থানীয় কৃষি অধিদফতর, পশু সম্পদ অফিস এবং স্থানীয় সমিতির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।

image_printPrint