নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে

109

ঢাকা, ১৩ জুলাই, ২০১৯ (বাসস) : অতি ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দেয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দেশের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ৯৩টি পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সোমেশ্বরী, কংস, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ধরলা, তিস্তা, ঘাগট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এই ১৫টি নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন নদ-নদীর পানি ৭৯টি পয়েন্টে বৃদ্ধি ও ১১টি পয়েণ্টে হ্রাস পেয়েছে। শুক্রবার ৭টি নদীর ১২টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
বন্যা পূনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বন্যা উপদ্রত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হয়েছে এবং বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে মেডিকেল টিম এবং জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে।
বাসস’র নীলফামারী সংসাদদাতা জানান, জেলায় তিস্তা নদীর পানি আজ বিপদসীমার ৩০ সেণ্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা ইউনিয়নের তিস্তা নদী বেস্টিত প্রায় ১৫ টি চর গ্রামের প্রায় ২০ সহ¯্রাধিক পরিবার পানিবন্দী রয়েছে।
ওই এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানান, পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটায় বন্যাকবলিত এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে নেয়া হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক শাহিনুর আলম বলেন, ‘বন্যাকবলিত ডিমলা উপজেলায় ১৫০ মেট্রিকটন চাল, এক হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব বিতরণের কার্যক্রম চলছে। আরো নূতন করে ৫০০ মেট্রিক টন চাল, ৫ লাখ টাকা, ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদের বরাত দিয়ে বগুড়া সংবাদদাতা জানান, বেলা ১২ টায় সারিয়াকান্দি উপজেলার মথুরাপাড়ায় যমুনা নদীর পানি বিপদ সীমার ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ১৬ দশমিক ৭৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
জেলা ত্রান কর্মকর্তা আজাহার আলী মন্ডল জানান, ২ হাজার কার্টুন শুকনা খাবার, ২০০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৩ লাখ টাকা হাতে রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বন্যা প্রবন এলাকা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পাঠানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, ৫ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ৬টি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি শনিবার ৪টা পর্যন্ত বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলা সদরের সঙ্গে তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জ-হালুয়ারঘাট সড়ক ভেঙে সদর উপজেলার কোরবাননগর ইউনিয়নের একাংশ, সুরমা ইউনিয়নের একাংশ, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের একাংশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই সড়কের ভাঙন বড় হচ্ছে। এই ভাঙন দিয়ে সুরমা’র পানি কোরবাননগরের ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করছে। শহরের নবীনগর, হাছননগর, শান্তিবাগ, নতুনপাড়া, বাঁধনপাড়াসহ পূর্বাঞ্চলে ঘরবাড়িতে পানি ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া জানান, সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, দোয়ারাবাজার উপজেলা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা, জামালগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থির অবনতি হয়েছে। চরাঞ্চলের প্রায় দু’শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ১০ হাজার পরিবারের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ও ধরলা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানিও বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। রৌমারী উপজেলার বাগুয়ারচরে নদী ভাঙনের কারণে ৫০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।
এদিকে সদরের হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব, উলিপুর উপজেলা বজরা ইউনিয়নের চাঁদনির চর বজরায় এবং রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুর হেলান গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে ।
কুড়িগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক,হাফিজুর রহমান জানান, বন্যা মোকাবেলায় সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৫০ মেট্রিক টন চাল, ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও ২ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট উপজেলা পর্যায়ে বন্টন করা হয়েছে। মজুদ আছে ১৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩ লাখ টাকা।
শেরপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী রয়েছে ৫ হাজার পরিবার। প্লাবিত গ্রাম গুলোর কাঁচা ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজি, পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে।
বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশংকা উপজেলা প্রশাসনের। তবে যেকোন পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত আছে বলে জানান ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান, ৬৮ হেক্টর জমির রোপা আমন বীজতলা আংশিক ও ৪৪ হেক্টর জমির সম্পূর্ণ এবং ১১ হেক্টর জমির সবজি আবাদ আংশিক ও ৮ হেক্টর জমির সম্পূর্ণ আবাদ ঢলের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক এটিএম জিয়াউল হক বাসসকে বলেন, বন্যা পরিস্থিতি এখনও অবনতি হয়নি। তবে কিছু নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছি। এজন্য একটি বন্যা কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।
টাঙ্গাইল সংবাদদাতা জানান, জোয়ারের পানি আসার শুরুতেই যমুনা নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে বর্ষার শুরুতেই টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মাহমুদনগর ইউনিয়ন ও ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের ঘর-বাড়ি ও ফসলি জমি যমুনার পেটে চলে যাচ্ছে।
কুষ্টিয়া সংবাদদাতা জানান, পদ্মা-গড়াই নদীতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বন্যা বা বড় ধরণের ক্ষতির আশংকা নেই।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পিযুষ কুন্ডু জানান, গত তিনদিনে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪ সেন্টিমিটার। আজ বিকেল ৪টা পর্যন্ত পদ্মা নদীর হাডিংঞ্জ ব্রীজ পয়েন্টে পানি ৮ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এখানে বিপদসীমা ১৪ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার নির্ধারণ রয়েছে। গড়াই নদীর রেলসেতু পয়েন্টে ৬ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এখানে বিপদসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার নির্ধারণ আছে।

image_printPrint