বিলুপ্ত প্রায় ফসলের আবাদ ফেরাতে সফল সৈয়দপুরের কৃষক বাবু

295

নীলফামারী, ৩০ জুন, ২০১৯ (বাসস) : সরকারি চাকরি ছেড়ে কৃষিতে সফল এক কৃষকের নাম সৈয়দপুরের আহসান-উল হক বাবু। স্বল্প দিনের ধারাবাহিক সফলতায় উপজেলায় পরিচিত হয়েছেন একজন আদর্শ কৃষক হিসেবে।
জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের অসুরখাই গ্রামে রয়েছে ওই কৃষকের কৃষি খামার। প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি অতি প্রাচীন ফসলের জাত রক্ষায় কাজ করছেন তিনি। সে চেষ্টায় তিনি এবারে আবাদ করেছেন পার্পল ভ্ট্টুা। প্রাচীন পেরুভিয়ান জাতের ওই ভুট্টার দানা গাঢ় জাম রংয়ের। বিলুপ্ত প্রায় ওই ভুট্টার দানা সাধারণ ভুট্টার চেয়ে অতিমাত্রায় পুষ্টিসমৃদ্ধ।
তাঁর খামারে আরো স্থান পেয়েছে প্রাচীনকালের বিখ্যাত ‘খোরাসান’ গম। ‘রেইজ বেড ফেরো এ- টুইন প্লানটেশন’ পদ্ধত্তিতে গমের আবাদ করে পেয়েছেন অতিমাত্রায় ফলন। এছাড়াও তাঁর সফলতার ঝুড়িতে জমা হয়েছে দেশীয় বিলুপ্ত প্রায় ধান কাটারিভোগ, কালোজিরা, বালাম, লক্ষীদিঘা, ধনিয়া, রাঁধুনীপাগল, সাহেব চিকন, কালাভাত ধানের আবাদ। পাশাপাশি ড্রাগনসহ বিভিন্ন প্রজাতির জনপ্রিয় আম, মালটা, বিভিন্ন জাতের লিচু এবং অতিমাত্রায় উপকারী অ্যাভাকাডো, রামবুটান ফল ও কফির সফল চাষীও তিনি।
পার্পল ভুট্টা
ভিন্ন রঙের পার্পল ভুট্টার জাতটি অতি প্রাচীন এবং উচ্চ পুষ্টিমান সমৃদ্ধ। প্রাচীনকালে পেরুর আদিবাসীরা এ রঙিন ভুট্টা মুখরোচক খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। ইনকান সভ্যতার অধিবাসীরা রঙিন ওই ভুট্টার রস বেভারেজ (পানীয়) হিসেবে ব্যবহার করতেন। ব্লুবেরীর চেয়েও এ রঙিন ভুট্টা ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। যা ডালিমের দানার মত কাচাও খাওয়া যায়।
কৃষক বাবু জানান, সুস্বাদু ওই ভুট্টা খেতে রাজশাহীর বিখ্যাত পাকা ফজলি আমের সমতুল্য মিষ্টতাবিশিষ্ট। রঙিন ওই ভুট্টার মিষ্টতা ২০, আর পাকা ফজলি আমের মিষ্টতা ১৯।
আবাদের প্রক্রিয়া
দেড় ইঞ্চি গভীরতা ও এক ইঞ্চি চওড়া পটে একটি করে বীজ বপন করেন তিনি। ১২ দিন বয়সী চারা “রেইজড বেড ফারো অ্যান্ড টুইন প্লাটেশন” পদ্ধতিতে জমিতে রোপণ করেন গত বছরের ২২ নভেম্বর। রোপিত প্রতিটি চারা থেকে ৩ থেকে ৪টি করে কার্যকরী কুশি বের হয়। প্রতিটি গাছে ৩ থেকে ৪ টি ভুট্টার মোচা হয়। অর্গানিক পদ্ধতিতে এ ভুট্টা চাষে বায়োগ্যাস স্লারী, কেঁচো সার, হাড়ের গুঁড়া, শিংয়ের গুঁড়া, কোকো কয়ার ও সামান্য পরিমানে ডিএপি, এমওপি এবং ইউরিয়া সার ব্যবহার হয়েছে। মেহগিনি ও নিমতেল ব্যবহার করা হয়েছে কীটনাশক হিসেবে। অর্গানিক ভাবে ওই রঙিন ভুট্টার আবাদে মোটেও পোকার আক্রমণ দেখা যায়নি।
খোরাসান গমের আবাদ
বিখ্যাত ‘খোরাসান’ জাতের গম আবাদেও সফল কৃষক বাবু। প্রাচীন ওই গমের ইতিহাস থেকে জানা গেছে মিশনের পিরামিডের মধ্যে ফারাওদের মমীর পাশে রক্ষিত যাবতীয় পণ্য সামগ্রীর সঙ্গে ‘খোরাসান’ ওই গমও পাওয়া যায়।
গমের আকৃতি অন্যান্য গমের তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা, আকর্ষণীয় রং এবং মিষ্টিগন্ধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক আমেরিকান বৈমানিক মিশর থেকে সংগৃহিত খোরাসান গমের কিছু বীজ উত্তর আমেরিয়কায় নিয়ে যান। সম্প্রতি কানাডা থেকে আগত সিলেটের আব্দুল বাসিত সেলিমের কাছ থেকে খোরাসান গমের বীজ সংগ্রহ করেন কৃষক বাবু। পরীক্ষামূলক চাষ করে সফল হয়েছেন তিনি।
আবাদের প্রক্রিয়া
ট্রেতে তৈরি বীজতলা থেকে ১২ দিন বয়সী গমের চারা জমিতে লাগানো হয়। মূলত “রেইজড বেড ফারো অ্যান্ড টুইন প্লাটেশন” পদ্ধতিতে ওই চারা লাগাতে হয় নভেম্বরে প্রথমদিকে। একটি করে চারা সারিবদ্ধভাবে লাগিয়ে দুই রেইজড বেডের মাঝে ফারোতে থাকবে সেচ ব্যবস্থা। আড়াই ফুট প্রস্তের বেডের একটি সারি থেকে আরেকটি সারির দূরত্ব থাকে এক ফিট।
বাবু জানান, প্রতিটি গমের গাছ থেকে সর্বোচ্চ কুশি আসে ১২৫টি। আর কার্যকরী সর্বোচ্চ গমের শীষ হয়েছে ৯০ টির মতো। এ গমের চাষ সম্পূর্ণ অর্গানিকভাবে করা হয়েছিল। অর্গানিক সার হিসেবে বায়োগ্যাস স্লারী, কেঁচো সার, হাঁড়ের গুড়া, শিংয়ের গুঁড়া, কোকো ডাষ্ট ও সামান্য পরিমানে ডিএপি, এমওপি এবং ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। মিষ্টিগন্ধী ওই গমের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। মূলত জাপান এর প্রধান ক্রেতা।
গত মৌসুমে ঘোরাসান বাদেও আরো তিনটি উচ্চ পুষ্টিমান সম্পন্ন গমের জাতের গবেষণামূলক চাষ করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে একটি জাত উচ্চমাত্রায় জিংক সমৃদ্ধ। ফলন হয়েছে হেক্টর প্রতি ছয় টন। যা এযাবৎকালের রেকর্ড পরিমান ফলন।
ড্রাগন চাষেও উজ্জল দৃষ্টান্ত
কৃষক বাবু ড্রাগন চাষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তাঁর সাফল্যে উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ওই ফলের চাষ।
বাবু জানান, ২০১৬ সালে ৬০ শতক জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। ড্রাগন গাছের জন্য প্রয়োজন স্থায়ী খুটি ও খুটির মাথায় পরিত্যক্ত টায়ার। এজন্য ২৯৯ টি কংক্রিটের পিলার স্থাপন করে প্রতি পিলারের চারটি করে চারা লাগান। ৬০ শতক জমিতে রয়েছে এক হাজার ২০০ চারা। চারা লাগানোর ১১ মাসের মধ্যে ফল পান তিনি। একটি গাছ ফল দেয় ২০ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত।
বাবুর সফলতায় উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ছে ড্রাগন চাষ। লাভজন হয়ে উঠেছে অনেকের বাগান। তাদের মধ্যে কামারপুকুর ইউনিয়নের পাকাতিপাড়া গ্রামের মো. রাশেদুজ্জামান মানিক ও মো. সাজেদুর রহমান লেবু, দক্ষিণ অসুরখাই গ্রামে মো. আব্দুর রাজ্জাক রয়েছেন।
কাটারিভোগ,কালিজিরা ও বালাম ধানের ফলন বৃদ্ধিতে সফল তিনি
রংপুর এবং দিনাজপুর অঞ্চলের কাটারিভোগ,কালিজিরা ও বালাম ধান বিলুপ্ত প্রায়। বিশেষ পদ্ধত্তিতে এসব ধান চাষ করে উচ্চ ফলন পেয়েছেন কৃষক বাবু।
বাবু জানান, বীজতলায় বীজ বপনের ১৪ দিনের মধ্যে তা জমিতে লাগান। প্রথমে ৫৫ শতক জমিতে লাগান তিন জাতের চারা। এর মধ্যে কাটারিভোগ ১৫ শতক, কালিজিরা ১৫ শতক ও বালাম ২৫ শতক জমিতে। বেডের সাইজ প্রস্থে ৩ ফুট। রেইজবেড পদ্ধত্তিতে একটি সারি থেকে অপর সারির দূরত্ব এক দশমিক আট ফুট। চারা থেকে চারার দূরত্ব এক দশমিক তিন ফুট। একটি চারার সর্বোচ্চ ১৫২ টি কুশি বের হয়। সেচের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বেড়ের ফাঁকা জায়গা। বায়োগ্যাস স্লারী, খৈল, ভার্মি কম্পোট, হাঁড়ের গুড়া ও স্বল্প পরিমাণে ডিএপি, এমওপি এবং ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়। চারা রোপণের ১৪৫ দিনের মধ্যে ধান কেটে ঘরে তোলেন।
তিনি বলেন, আমার মূল উদ্দেশ্য বিলুপ্ত জাতের ফসলের আবাদ ফিরিয়ে আনা। আধুনিক এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বেশি ফলনের পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ করে তা সাধারণ কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।
বাবুর পরিচিতি
সরকারী চাকরী জীবী বাবা মরহুম তছির উদ্দিন সরকারের চার ছেলে তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট বাবু। তার বাবা চাকরীজীবী হলেও ছিলেন একজন আদর্শ কৃষক। বাবার আদর্শ লালন করে স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি চাকরি ছেড়ে কৃষিতে আসেন ১৯৯৯ সালে। ভারতের হায়দারাবাদ, পুণে, মুম্বাইয়ে প্রশিক্ষণ নেন। ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও অন্যান্য বেসরকারি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বীজ উৎপাদনকারী চুক্তিভিত্তিক কৃষক বাবু। সজীব সীডস্ নামে বীজের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার।

image_printPrint