বাজেটে সব শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে : সরকারি দল

143

সংসদ ভবন, ২৫ জুন, ২০১৯ (বাসস) : প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা বলেছেন, বাস্তবায়নযোগ্য ও জনকল্যাণমুখী এ বাজেটে সব শ্রেণীর মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তারা বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশের গত ৪৮ বছরের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট পেশ করে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আজ বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে অধিবেশনের শুরুতে মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা-উত্তর টেবিলে উপস্থাপন শেষে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়। এক পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
গত ১৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ,হ.ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন।
২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনার ৭ম দিনে আজ বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাবউদ্দিন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সরকারি দলের মোহাম্মদ নাসিম, ইঞ্জিনিয়র মোশাররফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, আ.স.ম ফিরোজ, শেখ ফজলে নূর তাপস, ইসরাফিল আলম, বীরেন শিকদার, আবু জাহির, মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, তানভীর ইমাম, মো. শাহজাহান মিয়া, আবদুল মজিদ, তাহজিব আলম সিদ্দিকী, ছোট মনির, বেগম সাগুফতা ইয়াসমিন, ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, খাদিজাতুল আনোয়ার, মনিরা সুলতানা, জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান, বেগম নাসরিন জাহান রতœা, বিএনপির হারুন অর রশিদ, জাসদের মইনউদ্দিন খান বাদল আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ দৃশ্যমান। সরকারের আগের বাজেটগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে বলেই এখন দেশের অর্থনীতির প্রতিটি সূচক এগিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, সারা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষ্ময়। রফতানি বিগত ২০০৫-০৬ অর্থবছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৩ গুণ বেড়েছে। এবার হয়তো ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানী করা সম্ভব হবে। ২০২১ সালে হবে ৬০ বিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ বছর রমজান মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল, কোন জিনিসের দাম বাড়েনি। জিডিপিতে শিল্পের অংশগ্রহণ এখন প্রায় ৩১ শতাংশ। তিনি বাজেটে পোশাকখাতে ভর্তুকি ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ করার দাবি জানান।
তিনি বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কথা বলা হয়েছে। কালো টাকা কথাটা ঠিক না। এটাকে অপ্রদর্শিত অর্থ বলা যায়। এই অপ্রদর্শিত অর্থকে সুযোগ দিলে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়বে। এই কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে সবার জন্য ১০ শতাংশ ট্যাক্স সুবিধার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যে ১শ’ জনের কর্মসংস্থান করবে আর যে ৫শ’ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে- সবার জন্য সমান সুযোগ দেয়ার বিষয়টা পুনরায় বিবেচনা করা দরকার।
সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, এবারের বাজেট একটি বাস্তবসম্মত ও জনগণের ভাগ্যোন্ননের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ এবং জিডিপির ২ দশমিক ২৪ শতাংশ। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬৪ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকার সক্ষম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সরকারি দলের সদস্য মোহাম্মদ নাসিম সঞ্চয়পত্রের উপর আরোপিত উৎসে কর প্রত্যাহার, গাড়ি আমদানির উপর ট্যাক্স বাড়ানো, ভোজ্য তেলের উপর কর প্রত্যাহার এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কমানোর প্রস্তাব করেন।
ভারত ও ভিয়েতনামে শতভাগ বাজেট বাস্তবায়নের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এদেশে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু কর্মকর্তা দায়ী, যারা দীর্ঘদিন এই সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চাচ্ছে। দৃঢ়ভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে। যারা বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে না, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
ঋণ খেলাপীদের কোন অবস্থাতেই ছাড় দেয়া যাবে না উল্লেখ করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, কৃষক ১-২ হাজার টাকার জন্য সার্টিফিকেট মামলার আসামী হয়, আর হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপী হয়ে ঋণ খেলাপীরা বারবার তাদের ঋণ রিসিডিউল করার সুযোগ পায়, এটা হতে পারে না। ঋণ খেলাপীদের টাকা আদায় করতে না পারলে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে এই টাকা সেবা খাতে বিদ্যুত ও গ্যাসে ভর্তুকি দেয়ার দাবি জানান।
তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী রয়েছে যারা ব্যাংক, গার্মেন্টস, ওষুধ কোম্পনীর মালিক, এমনকি সংবাদপত্রের মালিকও। এ ধরনের বহুবিদ বিশেষণে বিশেষায়িত ব্যবসায়ী এদেশে রয়েছে। এমন কি তারা সরকারি দলে যোগ দিয়ে ক্ষমতাবান হয়ে যাচ্ছে। এসব সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীরা আমাদের বন্ধু হতে পারে না। এই সংসদ হবে রাজনৈতিক নেতাদের, যারা রক্ত দিয়ে ঘাম দিয়ে এদেশকে এবং আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যারা কোনদিন রাজনীতি করেনি, কোনদিন রাজপথে আন্দোলন করেনি, ওইসব ব্যবসায়ীরা বিপদে দলের পাশে থাকে না, পালিয়ে যায়। তিনি এসব ব্যবসায়ীরা কিভাবে পত্রিকা-টিভির মালিক হলেন, তা জানতে চান। তিনি বলেন, তারা এদিকেও সুবিধা নেয়, ওই দিকেও সুবিধা নেয়।’
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মিথ্যা কথা বলায় বিএনপি চ্যাম্পিয়ন। এরা ইভিএমএ’র বিরোধীতা করলেও বগুড়ায় ইভিএম-এ প্রায় ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে। এখন তারা বলবে ইভিএম-এ ভোট না হলে আরো বেশি ভোট পেতেন।
বিএনপি পদে পদে ভুল করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা সঠিক সময়ে নির্বাচনে আসে না, আর নির্বাচনে এসেও মাঠ ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ খালি মাঠে গোল দিয়েছে।
শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট জনকল্যাণমুখী। এই বাজেট বাস্তবায়নে দেশের মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণ হবে।
তিনি বলেন, বেসরকারি কল কারখানার মতো সরকারি কল কারখানায় আমদানিকৃত কাঁচামালের উপর ৫ শতাংশ অগ্রিম ট্যাক্স প্রদান করতে হয়। কিন্তু নানা কারণে সরকারি শিল্প কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্য বেসরকারি শিল্প কারখানায় উৎপাদিত পণ্য প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না। তাই অধিকাংশ সরকারি শিল্প কারখানা লাভের মুখ দেখছে না। তিনি সরকারি শিল্প কারখানার জন্য আমদানিকৃত কাঁচামালের অগ্রিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে ২৪ হাজার ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিএনপি সরকারের সময়ে ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাজেটে বরাদ্দ বেড়ে হয় ৫ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬২ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৯ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষার প্রসারে সহায়তাকরণ এবং প্রাথমিক শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়াসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছেন।
সরকারি দলের সদস্য ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা বলেন, বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এরা ইসলাম মানে না, জামায়াতে ইসলামকে মানে। এটি জাতীয়তাবাদী দল নয়, এটি একটি জামায়াতিবাদী দল।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের অন্য সদস্যরা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতি আরো মজবুত হয়েছে। এটা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থ বছরের জন্য সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশী বাজেট দেয়া সম্ভব হয়েছে। সরকারের গত দুই মেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধারাবাহকভাবে ৬ শতাংশের বেশী অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে তারা বলেন, ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে এটি কোন বড় আকারের বাজেট নয়। আর এ বাজেট বা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কোন অবস্থায়ই বিশাল নয়।এ সরকারে দেয়া বিগত বাজেটগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রমান হয়েছে সরকার আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে। তবে তিনি দেশের রাজস্ব আয় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সরকারি দলের সদস্যরা প্রস্তাবিত বজেটকে ব্যাতিক্রম উল্লেখ করে বলেন, এ বাজেটে ১শ’ কোটি টাকা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া আরো ১শ’ কোটি টাকা নদী ভাঙ্গন কবলিতদের পুর্নবাসনের জন্য রাখা হয়েছে। এটা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া তারা বর্তমান সরকারের আমলে কৃষি, খাদ্য, আবাসন, স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অবকাঠামো খাত, সামাজিক নিরাপত্তাসহ সবখাতে অর্জিত সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেন।
সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের যে অভূতপূর্ব অর্থনেতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা আজ দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন সাফল্য আজ বিস্ময়।

image_printPrint