জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ঢাকা ও হেলসিংকি একযোগে কাজ করবে

464

হেলসিংকি, ফিনল্যান্ড, ৪ জুন, ২০১৮ (বাসস) : বাংলাদেশ এবং ফিনল্যান্ড জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিষয়ে একযোগে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
আজ এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি সৌলি নিনিয়েসটোর এক আনুষ্ঠানিক বৈঠক থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে সফল প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোরালো সমর্থন ও প্রত্যাশা করেন।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের বিষয়ে বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর স্পিস রাইটার (সচিব) মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত মোকাবেলায় তাঁর সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাগরের পানির উচ্চতা মাত্র ১ মিটার বৃদ্ধি পেলেই সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ তলিয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের জলবায়ু তহবিল গড়ে তোলার প্রসংগ উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলায় বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তোলা এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহনী গড়ে তোলার বিষয়টি ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাগরের জলের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির আশংকায় ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এ সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিশেষ করে জলোচ্ছ্বাস থেকে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করতে বৈশ্বিক আবহাওয়াজনিত সতর্কবার্তা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এত ব্যাপক সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদান দেশটির জন্য কঠিন বিষয়।
আর এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেও মিয়ানমার তাঁর নাগরিকদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক নিজ দেশে ফিরিয়ে না নিয়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর উদ্বেগের কথা জানান।
ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতির এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী জানান, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাশে আশ্রয় প্রদানের পরও দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এই পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী এবং তাঁর প্রতিবেশি সকল দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলে।
দেশের উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ বছর আমাদের জিডিপি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা বলেন এবং ফিনল্যান্ডের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহবান জানান।
সারাদেশে ১শ’ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় তাঁর সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ফিনল্যান্ডের বিনিয়োগকারীরা চাইলে এখানে তাদের নিজস্ব একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলও গড়ে তুলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করায় ফিনল্যান্ডের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফিনল্যান্ড যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তাঁকে আমরা সবসময়ই মূল্য দেই।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আজন্ম সংগ্রাম এবং তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের কথাও উল্লেখ করেন।
ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতির জানার আগ্রহের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ’৭৫-এ জাতির পিতার সপরিবারে হত্যাকান্ডের পর তাঁর নিজস্ব সংগ্রামের কথাও স্মৃতিচারণ করেন।
’৭৫-এর পর দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটাতে বাধ্য হওয়ার পর ১৯৮১ সালে তিনি জনগণের সহযোগিতা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই জনগণই আবার তাঁকে ভোট দিয়ে চারবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈঠকে ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং আইওএম’র উপ-মহাপরিচালক পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হককে নির্বাচিত করার জন্য ফিনল্যান্ডের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতির বাসভবনে পৌঁছলে রাষ্ট্রপতি সৌলি নিনিয়েসটো তাঁকে স্বাগত জানান এবং প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শন বইয়েও স্বক্ষর করেন, বলেন নজরুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী ৫ দিনের সরকারি সফরে সোমবার এখানে এসে পৌঁছেন।